এই জঘন্য ও অমানবিক অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে থাইল্যান্ডের পুলিশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি সংঘবদ্ধ ও সুচতুর অপরাধী চক্র অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই অপহরণের ছক কষেছিল।
থাইল্যান্ডের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শ্বাসরুদ্ধকর ও দুঃসাহসিক অভিযানের পর অবশেষে ওই তিন তরুণকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনা পর্যটকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
থাইল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ব্যাংকক পোস্টের দেওয়া তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার রাজধানী ব্যাংককের খ্লং তান এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে দেশ ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতিকালে ওই পাঁচ অভিযুক্তকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃত এই পাঁচ ভারতীয় নাগরিকের পরিচয় ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। তারা হলেন-আটত্রিশ বছর বয়সী অবতার সিং ও জগজিৎ সিং, চব্বিশ বছর বয়সী রামবালক কুমার, সাঁইত্রিশ বছর বয়সী সুখবীর সিং এবং সাতাশ বছর বয়সী কুলরা সিং।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশের প্রাথমিক ও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে তারা এই লোমহর্ষক অপহরণের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন এবং পুরো চক্রান্তের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন।
পুলিশের তদন্তে এই ভয়ংকর ঘটনার পেছনে একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক আন্তঃদেশীয় অপরাধ চক্রের সরাসরি সম্পৃক্ততার সন্ধান পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, প্রায় এক মাস আগে একটি জনপ্রিয় চ্যাটিং অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে অজ্ঞাত এক পাকিস্তানি ব্যক্তির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
মূলত সেই ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার ভিত্তিতেই এই নিখুঁত অপহরণের ঘটনাটি সংঘটিত হয়। থাইল্যান্ডের পুলিশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, এই পুরো চক্রান্তের মূল হোতা মধ্যপ্রাচ্যের শহর দুবাইয়ে বসে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কলকাঠি নাড়ছিলেন।
অপহৃত তরুণদের পরিবারের কাছ থেকে আধুনিক ও ট্রেস করা কঠিন এমন ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল ওই মূল পরিকল্পনাকারীর প্রধান লক্ষ্য। এই অপহরণ মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করার বিনিময়ে গ্রেপ্তারকৃত পাঁচ ভারতীয়কে অপহৃতদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া নগদ অর্থ, মূল্যবান জিনিসপত্র এবং থাইল্যান্ড ছেড়ে নিরাপদে নিজ দেশে পালানোর জন্য বিমানের টিকিট দেওয়ার লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে ওই তিন তরুণকে অত্যন্ত কম খরচে পাতায়ায় সাত দিনের একটি আকর্ষণীয় ছুটির প্যাকেজের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। সেই সুদৃশ্য ফাঁদে পা দিয়ে তারা যখন থাইল্যান্ডে পৌঁছান, তখন তাদের অত্যন্ত কৌশলে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর তাদের একটি নির্জন ও গোপন বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়। মুক্তিপণের দাবিতে সেখানে তাদের ওপর দিনভর চালানো হয় অমানবিক, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যা যেকোনো সুস্থ মানুষকে শিউরে ওঠার মতো।
এদিকে, অপহৃত তরুণদের পরিবারের সদস্যরা ভারতে বসে এই বিপদের কথা জানতে পেরে চরম আতঙ্কগ্রস্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েন। অপরাধীরা মুক্তিপণ দাবি করে বেশ কয়েকটি ভিডিও কল পাঠায়, যেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় তরুণদের হাত-পা শক্ত করে বেঁধে বেধড়ক মারধর করা হচ্ছে।
প্রতিটি পরিবারের কাছে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় চল্লিশ লাখ রুপি করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এই মর্মান্তিক ভিডিও পাওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ডে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করা হয়।
পরিবারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়ার পর ভারতীয় দূতাবাস গত একুশ জুলাই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চোনবুরি ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং পাতায়া সিটি পুলিশকে অবহিত করে। দূতাবাসের এই দ্রুত হস্তক্ষেপে থাইল্যান্ডের পুলিশ নড়েচড়ে বসে এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।
এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার অসংখ্য ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং নির্ভরযোগ্য গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গত সোমবার সন্ধ্যায় পাতায়ার একটি দোতলা টাউনহাউসে সাঁড়াশি অভিযান চালায় থাইল্যান্ড পুলিশ।
সেই সন্দেহভাজন বাড়ি থেকেই তেইশ বছর বয়সী মোহিত, চব্বিশ বছর বয়সী আশিশ এবং বিশ বছর বয়সী হিমাংশু নামের ওই তিন হতভাগ্য তরুণকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় দোতলার একটি অন্ধকার কক্ষে তাদের হাত-পা বাঁধা এবং মুখ কস্টেপ দিয়ে শক্ত করে আটকানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিনের অমানবিক নির্যাতনে এই তরুণদের সারা শরীরে ছিল আঘাতের নির্মম ও গভীর চিহ্ন। পুলিশ ওই দুর্ঘটনাস্থল তল্লাশি করে নির্যাতনের কাজে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি কাঠের লাঠি, কস্টেপ এবং একটি লাল রঙের স্প্রে পেইন্ট উদ্ধার করেছে।
পুলিশের ধারণা, পরিবারের লোকজনকে ভিডিও কলে ভয় দেখাতে এবং দ্রুত টাকা দিতে মানসিকভাবে বাধ্য করতে লাল রঙের স্প্রে ছিটিয়ে তরুণদের গায়ে কৃত্রিম রক্তের দাগ বা ভুয়া ক্ষতচিহ্ন তৈরি করা হতো। উদ্ধার পাওয়া তরুণেরা পুলিশকে আরও একটি ভয়ংকর তথ্য দিয়েছেন।
তারা জানান, তাদের এই বন্দিশালায় আনার আগে সেখানে আরও এক ভারতীয় নাগরিককে একই কায়দায় জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই ব্যক্তির পরিবার অপরাধীদের দাবি অনুযায়ী প্রায় ত্রিশ লাখ রুপি মুক্তিপণ প্রদান করার পরই কেবল তাকে জীবিত অবস্থায় মুক্তি দেওয়া হয়।