শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস সংঘর্ষে ত্রিশ জনের অধিক নিহত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস সংঘর্ষে ত্রিশ জনের অধিক নিহত
ছবি : Collected

পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন আজাদ কাশ্মীরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সহিংসতা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই রাজনৈতিক সংকট ও সংঘর্ষের জেরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ মোট ত্রিশ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া গেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন বর্জন এবং কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ কর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ পুরো অঞ্চলে চরম থমথমে পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

 

গত কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের ধারাবাহিকতায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, আজাদ কাশ্মীর অঞ্চলটি মোট দশটি জেলায় বিভক্ত যা প্রশাসনিকভাবে মুজাফফরাবাদ, পুঞ্চ এবং মিরপুর-এই তিনটি প্রধান বিভাগে পরিচালিত হয়ে আসছে।

 

এর মধ্যে মিরপুর বিভাগের অন্তর্ভুক্ত কোটলি, মিরপুর এবং ভিম্বার নামক তিনটি জেলায় গত সোমবার, ২৭ জুলাই বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। আজাদ কাশ্মীর বিধানসভায় মোট আসন সংখ্যা বায়ান্নটি। যার মধ্যে তেত্রিশটি আসনে স্থানীয় জনগণ সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান।

 

বাকি কুড়িটি আসনের মধ্যে বারোটি আসন ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা শরণার্থীদের জন্য এবং অবশিষ্ট আটটি আসন নারী, উলেমা ও টেকনোক্র্যাটদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

 

এই বিধানসভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মূলত দীর্ঘদিন ধরে প্রধান বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। আজাদ কাশ্মীরভিত্তিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএকে) গত কয়েক মাস ধরে বিধানসভায় প্রচলিত ‘শরণার্থী কোটা’ স্থায়ীভাবে তুলে দেওয়ার দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

 

এই কোটা প্রথার বিরুদ্ধে তাদের তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন এবং জনসম্পৃক্ততার কারণে গত জুন মাসে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেননি, যার ফলে নির্বাচনকালীন সময়ে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

 

মূলত ২৭ জুলাই আজাদ কাশ্মীরের তিনটি বিভাগের দশটি জেলায় একযোগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নির্ধারিত ছিল। তবে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত তিন দফায় ভোট গ্রহণের নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

 

পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম দফায় গত ২৭ জুলাই কেবল মিরপুর বিভাগের জেলাগুলোতে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এরপর আগামী ২ আগস্ট এবং ১০ আগস্ট যথাক্রমে পুঞ্চ ও মুজাফরাবাদ বিভাগের বাকি সাতটি জেলায় পরবর্তী দুই ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং জম্মু ও কাশ্মীরের স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, গত সোমবার ভোটগ্রহণের দিন মিরপুর বিভাগের কোটলি, মিরপুর এবং ভিম্বার জেলার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএএকে নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে।

 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয় এবং সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যা ত্রিশের ঘর ছাড়িয়ে যায়। এর আগে গত মে ও জুন মাসে জেএএকের তীব্র আন্দোলনের সময় থেকেই পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার আজাদ কাশ্মীরজুড়ে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় এবং গোটা অঞ্চলে কঠোর সামরিক নজরদারি ও কড়াকড়ি আরোপ করে, যা ভোটগ্রহণের দিনও বলবৎ ছিল।

 

এই নির্বাচন এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আজাদ কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরাবাদের সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মুজাফফরাবাদের বাসিন্দা ফজল মাহমুদ বেইগ আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটি প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় জানান যে, সাধারণ মানুষ এই ধরনের নিয়ন্ত্রিত ও রক্তক্ষয়ী নির্বাচনী প্রক্রিয়া চায় না এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়িয়ে তারা এই রাজনৈতিক সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান প্রত্যাশা করেন।