বৃহস্পতিবার এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, রাজধানী দিল্লিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের যে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে।
দীপকের মতে, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নামা নিরীহ ছাত্রদের ওপর যেভাবে নির্মম আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং রাজপথে যে রক্ত ঝরেছে, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ব্যতীত কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সম্পূর্ণ দায়ভার কাঁধে নিয়ে অবিলম্বে অমিত শাহের পদত্যাগ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। এই দাবির ঠিক এক দিন আগে, অর্থাৎ বুধবার ভারতের জাতীয় সংসদেও একই রকম উত্তাপ পরিলক্ষিত হয়।
প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী নতুন বিল নিয়ে বিতর্কের সময় ভারতের লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি সরকারকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখেন। তিনি স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, গত বিশে জুলাই দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ‘ককরোচ’দের ডাকে যখন ছাত্ররা সংসদ অভিমুখে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা করছিল, তখন তাদের ওপর পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত ও বেআইনি বলপ্রয়োগ মূলত অমিত শাহের নির্দেশেই করা হয়েছিল।
ওই দিন আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল বেধড়ক লাঠিপেটাই করেনি, বরং নির্বিচারে কাঁদানে গ্যাস এবং প্রাণঘাতী ছররা গুলি ব্যবহার করেছিল, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সংসদে দাঁড়িয়ে রাহুল গান্ধীও এই নজিরবিহীন পুলিশি নিপীড়নের প্রতিবাদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক পদত্যাগ দাবি করেছিলেন।
বিরোধী দলনেতার সেই জোরালো বক্তব্যের চব্বিশ ঘণ্টা পার হতে না হতেই এবার সিজেপি প্রধানের মুখেও একই প্রতিধ্বনি শোনা গেল। পুলিশি নির্মমতার পাশাপাশি দীপকে ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির দলীয় কর্মীদের দিকেও সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন।
দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে আয়োজিত এই বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য সিজেপি বিপুল অঙ্কের বিদেশি অর্থ-সাহায্য পেয়েছে বলে সরকার সমর্থিত মহল থেকে যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, অভিজিৎ দীপকে তা অত্যন্ত কড়া ভাষায় খারিজ করে দিয়েছেন।
বিদেশি অনুদানের অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তীব্র কটাক্ষ করেন। দীপকে বলেন, যদি সত্যিই তাদের আন্দোলন পরিচালনার জন্য বিদেশ থেকে কোনো অবৈধ অর্থের জোগান এসে থাকে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বময় দায়িত্বে থেকেও অমিত শাহ যদি সেই অর্থপ্রবাহ আটকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হন, তবে সেই ব্যর্থতার দায়ভারও সম্পূর্ণভাবে সরকারের ওপরই বর্তায়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমন নিদারুণ প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরও অমিত শাহ কীভাবে নিজেকে আধুনিক রাজনীতির ‘চাণক্য’ বলে দাবি করতে পারেন? যদি এই অভিযোগ সত্যও হয়, তবুও তো চরম গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় নিয়ে তার পদত্যাগ করা উচিত বলে দীপকে মন্তব্য করেন।
শুধু তাই নয়, আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তুলেছেন সিজেপি প্রধান। তিনি দাবি করেন যে, বিশে জুলাইয়ের বিক্ষোভে দিল্লি পুলিশ সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে পাথর নিক্ষেপের একটি মিথ্যা নাটক সাজিয়েছিল, যাতে আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার একটি জোরালো অজুহাত তৈরি করা যায়।
ঘটনার বিশদ বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, বিশে জুলাই যন্তর মন্তর এলাকায় আগে থেকেই একটি মালবাহী বড় গাড়িতে করে বেশ কিছু পাথর এবং একটি ভাঙাচোরা গাড়ি সুকৌশলে এনে রাখা হয়েছিল।
মূলত পুলিশি অভিযানের একটি মিথ্যা যৌক্তিকতা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরার জন্যই এই সাজানো নাটক করা হয়। তিনি আরও মারাত্মক অভিযোগ করেন যে, পাথর নিক্ষেপের এই পুরো ঘটনাটি দিল্লি পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের পূর্বপরিকল্পিত ছক ছিল।
সেদিন মূলত বিজেপির লোকজনই ছদ্মবেশে এসে পাথর ছুড়েছিল, অথচ সুকৌশলে পুরো দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয় নিরীহ আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর। উল্লেখ্য, প্রশ্নফাঁস বিরোধী এই গণআন্দোলনের প্রবল চাপের মুখে পড়ে ইতোমধ্যেই গত পঁচিশে জুলাই ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন।
এই প্রাথমিক সাফল্যের পর বুধবার নিজের রাজ্য মহারাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে দফায় দফায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হচ্ছেন অভিজিৎ দীপকে। সেখানে তিনি ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তার দাবি, একটি বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সার্বিক দায়িত্ব সুচারুভাবে সামলানোর বদলে মোদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।
দীপকের ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন রাজনৈতিক পদ ছেড়ে ইন্টারনেট জগতের একজন বিনোদনকর্মী বা প্রভাবক হয়ে যাওয়া উচিত, কারণ সেই কাজেই তিনি সবচেয়ে ভালো দক্ষতা দেখাচ্ছেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর উচিত নিজের পদ ছেড়ে যোগ্যতর অন্য কোনো নেতার হাতে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়া।
সবশেষে সিজেপি প্রধান অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের সরকার এখনো আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বিক্ষোভ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও প্রশাসন সাধারণ ছাত্রদের খুঁজে বের করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করছে।
তিনি সরকারকে অবিলম্বে এই প্রতিহিংসামূলক হয়রানি বন্ধ করার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। দীপকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, যদি সরকার এই অগণতান্ত্রিক পথ থেকে সরে না আসে, তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দেশের সাধারণ জনগণ এবং আন্দোলনকারীরাই ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে এর সমুচিত জবাব দেবে।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরও যে আন্দোলনকারীদের ভেতরের ক্ষোভ এতটুকু প্রশমিত হয়নি, তা স্পষ্ট করে তিনি জানান যে, ঠিক যেভাবে শিক্ষামন্ত্রীকে গদি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে প্রয়োজনে দেশের সরকারও বদলে দেওয়া হবে। সাধারণ ছাত্রদের দাবি আদায়ে আগামী দিনে এই আন্দোলন আরও অনেক বড় ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।