শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনাকে ভারতে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া হয়নি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম

শেখ হাসিনাকে ভারতে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া হয়নি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের বা নিজ দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার।

 

একই সঙ্গে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ জানানো হয়েছে, তা বর্তমানে ভারতের প্রযোজ্য আইন এবং প্রতিষ্ঠিত আইনি পদ্ধতি অনুযায়ী অত্যন্ত গুরুত্ব ও সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

 

ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় উপস্থাপিত পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) স্বনামধন্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়, যা ইতিমধ্যে দুই দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্র সরকার গত বৃহস্পতিবার তাদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের করা আইনি অনুরোধটি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

 

ভারতের অন্যতম প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং বিরোধী দল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা শশী থারুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এই বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার দীর্ঘ আলোচনার পর প্রদত্ত সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে ভারত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বা অ্যাকশন টেকেন সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে এই প্রত্যর্পণের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

'ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ' শীর্ষক ওই সংসদীয় কমিটির নবম প্রতিবেদনে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও নীতিগত সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা সরকারের এই প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার লোকসভার অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়।

 

সংসদীয় ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের একটি বিচারিক আদালতে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদানের যে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়েছে, সে বিষয়টি সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণভাবে অবগত রয়েছে।

 

এই রায়ের পরপরই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য যে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে, ভারত সরকার সেটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আমলে নিয়েছে।

 

স্পর্শকাতর এই বিষয়টির আইনি এবং কূটনৈতিক পর্যালোচনার বর্তমান অগ্রগতি ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে সম্পর্কে কেন্দ্র সরকারকে নিয়মিতভাবে এই সংসদীয় কমিটিকে অবহিত রাখার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।

 

কমিটি আরও জানিয়েছে যে, শেখ হাসিনার ভারতে সাময়িক অবস্থান দেশটির দীর্ঘদিনের চিরায়ত ‘সভ্যতার আদর্শ এবং গুরুতর দুর্দশা বা অস্তিত্বের সংকটের সম্মুখীন হওয়া বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের জরুরি অবস্থায় আশ্রয় দেওয়ার যে মহান মানবিক ঐতিহ্য’, মূলত তার আওতাতেই অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।

 

তবে আশ্রয়ের এই মানবিক দিকটির সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে, ভারত সরকার অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করেছে যে, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা দলীয় তৎপরতা পরিচালনা করার জন্য কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।

 

ভারতের দীর্ঘদিনের অপরিবর্তিত ও সুনির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতি হলো, তাদের নিজ দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো প্রতিবেশী বা বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা কোনো দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ কখনোই কাউকে দেওয়া হবে না।

 

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ভারতের এই চিরাচরিত এবং কঠোর নীতি অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সংসদীয় কমিটি ভারত সরকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে।

 

তারা বলেছে, সরকার যেন প্রতিবেশীদের প্রতি তার চিরাচরিত ‘নীতিগত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ অব্যাহত রাখে। একই সঙ্গে এ ধরনের একটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতি যেন যথাযথ সংবেদনশীলতার সঙ্গে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে মোকাবিলা করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিগত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের চূড়ান্ত পতন ঘটে। প্রাণভয়ে এবং নিরাপত্তার খোঁজে দেশ থেকে পালিয়ে দ্রুত ভারতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

তার এই আকস্মিক ক্ষমতাচ্যুতির পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সুযোগ্য নেতৃত্বাধীন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তবে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয় প্রদানের পর থেকে স্বভাবতই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উষ্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে দৃশ্যমান অবনতি এবং কিছুটা টানাপোড়েন ঘটতে শুরু করে, যা কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে।

 

পরবর্তীতে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে একটি সর্বজনীন, অবাধ এবং বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে।

 

নতুন এই গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করার পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত পলাতক রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের সম্মুখীন করার বিষয়ে দৃঢ় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাটি সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আইনি উদ্যোগেরই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

- টাইমস অব ইন্ডিয়া