শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শ্রীলঙ্কার মহারা কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে

শ্রীলঙ্কার মহারা কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, বিপুল সংখ্যক সেনা ও কমান্ডো মোতায়েন

RNS News

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম

শ্রীলঙ্কার মহারা কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, বিপুল সংখ্যক সেনা ও কমান্ডো মোতায়েন
ছবি : Collected

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার একটি কারাগারে কয়েদিদের মধ্যে সংঘটিত এক ভয়াবহ দাঙ্গার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটির সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

রাজধানী কলম্বোর উপকণ্ঠে অবস্থিত মহারা কারাগারে শনিবার শুরু হওয়া এই চরম বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার পর, রোববার দেশটির সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং এলিট কমান্ডো বাহিনীর শত শত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

 

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাগারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের তলব করা হয়। মূলত কয়েদিদের মধ্যে সৃষ্ট তীব্র উত্তেজনা ও ব্যাপক ভাঙচুরের পর স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

 

শ্রীলঙ্কা পুলিশের উপমহাপরিদর্শক সঞ্জীব মেদাওয়াত সংবাদমাধ্যমের কাছে এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে জানিয়েছেন যে, মহারা কারাগারের ভেতরে কয়েদিরা শনিবার সংঘবদ্ধ হয়ে ভয়াবহ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। এই সময় তারা কারাগারের অভ্যন্তরীণ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভবন ধ্বংস করেছে।

 

কয়েদিদের এই আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত ও ধ্বংসাত্মক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত একজন কয়েদি নিহত হয়েছেন এবং আরও ছয়জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

 

তবে প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে কারাগারের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

 

কারাগারের মূল ফটকের বাইরে অপেক্ষমাণ সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে উপমহাপরিদর্শক সঞ্জীব মেদাওয়াত বর্তমান পরিস্থিতি ও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেন।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, কারাগারের ভেতরে সৃষ্ট চরম বিশৃঙ্খল পরিবেশের অবসান ঘটিয়ে পুনরায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিক্ষুব্ধ কয়েদিদের নিরাপদে নিজ নিজ কক্ষে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে আমরা সশস্ত্র বাহিনী এবং স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের সুদক্ষ কমান্ডোদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সহায়তা গ্রহণ করেছি।

 

সাধারণ কারারক্ষীদের পক্ষে এই বিপুল সংখ্যক বিক্ষুব্ধ কয়েদিকে নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ায় এই বিশেষায়িত এলিট বাহিনীর সহায়তা নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। তাদের পেশাদারিত্ব ও দ্রুত হস্তক্ষেপে কারাগারের ভেতরে একটি সম্ভাব্য বৃহত্তর বিপর্যয় ও রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

 

তবে কলম্বোর উপকণ্ঠে অবস্থিত এই মহারা কারাগারে এ ধরনের প্রাণঘাতী সহিংসতা ও রক্তপাতের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে এই একই কারাগারে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল।

 

সেই সময় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনতে কারারক্ষীদের চালানো গুলিতে অন্তত ১১ জন কয়েদি নিহত হয়েছিলেন এবং ১২০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ওই ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।

 

আশ্চর্যজনকভাবে, ২০২০ সালের ওই ঘটনার ঠিক এক মাস আগেই একই অঞ্চলের অপর একটি কারাগারে আরেকটি প্রাণঘাতী দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল, যা গোটা দেশকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

 

সেই পূর্ববর্তী দাঙ্গায় ১০ জন কারারক্ষী এবং ২১ জন কয়েদি প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনাগুলো শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বন্দি ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দুর্বলতার গভীর সংকটকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

 

শনিবারের সর্বশেষ দাঙ্গায় মহারা কারাগারের ভৌত অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুলিশের উপমহাপরিদর্শক মেদাওয়াত ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিতে গিয়ে জানিয়েছেন, বিক্ষুব্ধ কয়েদিরা মহারা কারাগারের ভেতরের রান্নাঘর, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত হাসপাতাল, সম্প্রতি নতুনভাবে নির্মিত একটি আধুনিক পুনর্বাসন ভবন এবং কর্মমুখী করার লক্ষ্যে স্থাপিত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

 

এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে কারাগারের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলো পুনরায় ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে দীর্ঘ সময় ও প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছেন।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোতে এই ধরনের ঘন ঘন দাঙ্গা ও সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত কয়েদির উপস্থিতি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, মহারা কারাগারটিতে এর মূল ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ বেশি কয়েদিকে অত্যন্ত গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল।

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট কারাগারটিতে মোট ৪ হাজার ১০০ জন কয়েদি অবস্থান করছিলেন, যা মানবাধিকার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার চরম পরিপন্থী। তবে এটি কেবল মহারা কারাগারের একক চিত্র নয়; গোটা শ্রীলঙ্কার প্রায় প্রতিটি কারাগারেই ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কয়েদি মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

 

অতিরিক্ত ভিড়, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, খাবারের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কয়েদিদের মধ্যে মানসিক চাপ ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করছে, যা এমন ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নিচ্ছে। কারাগারগুলোতে এই অতিরিক্ত কয়েদির চাপ সামাল দিতে গত মাসে দেশটির কর্তৃপক্ষ একটি নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল।

 

ঘোষণায় বলা হয়, অব্যবহৃত সরকারি ভবনগুলোকে সংস্কারের মাধ্যমে অস্থায়ী কারাগারে রূপান্তর করা হবে। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই মহারা কারাগারে এই ঘটনা প্রমাণ করে পরিস্থিতি কতটা নাজুক। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতাই এই উপচে পড়া ভিড়ের মূল কারণ।

 

শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোতে থাকা মোট কয়েদির তিন-চতুর্থাংশের বেশিই বিচারাধীন বন্দি; অর্থাৎ তারা এখনও দোষী সাব্যস্ত হননি, বিচারের প্রহর গুনছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বন্দিদের সিংহভাগকেই মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে আটক রাখা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা না হলে এমন মানবিক বিপর্যয় ও সহিংসতা রোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

 

- এএফপি