শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ ও ভারতের ছাত্র আন্দোলনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে তসলিমা, সিজেপি নেতার কড়া জবাব!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম

বাংলাদেশ ও ভারতের ছাত্র আন্দোলনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে তসলিমা, সিজেপি নেতার কড়া জবাব!
ছবি : Collected

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি দেশের গণআন্দোলন বা ছাত্রবিক্ষোভের প্রভাব ও প্রকৃতি প্রায়শই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি এমনই এক তুলনামূলক আলোচনার সূত্রপাত করে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন।

 

ভারতের সাম্প্রতিক একটি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সরাসরি তুলনা টেনেছেন তিনি। তবে তার এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে কড়া জবাব দিয়েছেন ভারতের উদীয়মান রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দীপক।

 

তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, দুটি ভিন্ন দেশের, ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ও সম্পূর্ণ ভিন্ন লক্ষ্যের আন্দোলনকে একই মাপকাঠিতে বিচার করা অত্যন্ত অযৌক্তিক এবং অনভিপ্রেত। রবিবার গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তসলিমা নাসরিন তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

 

তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, ভারতের রাজপথে চলমান সিজেপির এই আন্দোলন সম্পর্কে তিনি শুরু থেকে খুব একটা নিবিড়ভাবে খোঁজখবর রাখেননি। তবে সম্প্রতি এই আন্দোলনের একটি দৃশ্যমান খণ্ডচিত্র বা ভিডিও তার দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর, সেটি তাকে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

বাংলাদেশের সেই গণআন্দোলন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এই নির্বাসিত লেখিকা এক ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজকে সেই ছাত্র আন্দোলন চরমভাবে ধোঁকা দিয়েছে।

 

তসলিমা নাসরিন স্মরণ করিয়ে দেন যে, আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, শিক্ষার্থীরা কেবল সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক বাতিল চাইছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সেই মূল দাবি মেনেও নিয়েছিল।

 

দাবি আদায় হওয়ার পরও আন্দোলন না থেমে বরং তা সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপান্তরিত হওয়া নিয়ে তসলিমা নাসরিন গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্যমতে, একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকা আন্দোলনটি কীভাবে একটি নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হলো, তার পেছনের অদৃশ্য শক্তিগুলো পরবর্তীতে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে।

 

তিনি অভিযোগ করেন যে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে পুঁজি করে এই আন্দোলনের নেপথ্যে মূলত কট্টরপন্থী ও জিহাদি গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় ছিল। তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবেই এই আন্দোলনকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

 

তসলিমা নাসরিন তার মন্তব্যের উপসংহারে সতর্ক করে বলেন যে, ওই গণঅভ্যুত্থানের পরিণতি বা বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ ও সাধারণ মানুষের জন্য মোটেও কোনো ইতিবাচক বা কল্যাণকর ফল বয়ে আনেনি।

 

তসলিমা নাসরিনের এমন স্পর্শকাতর মন্তব্যের পর ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সোমবার ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দীপক এই তুলনার কড়া সমালোচনা করেন।

 

তিনি লেখিকার দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেন। দীপক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বাংলাদেশের সরকার পতনের আন্দোলন বা নেপালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে দিল্লির যন্তর মন্তরে সংঘটিত তাদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের তুলনা টানা একেবারেই অবাস্তব।

 

তার মতে, একটি নির্দিষ্ট মহলের ইন্ধনে তাদের যৌক্তিক আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করা এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর হীন উদ্দেশ্যেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ধরনের তুলনা করা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাদের আদর্শ, দাবি এবং আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা, তাই অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

 

উল্লেখ্য, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বিশেষ করে গত মাসে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে ককরোচ জনতা পার্টি।

 

তাদের এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যর্থতার দায়ভার গ্রহণ করে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সিজেপির ডাকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন খুব দ্রুতই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

 

দিল্লির কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের এই তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।

 

এই অভাবনীয় বিজয়ের পর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিজেপি এবং এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দীপকের অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে। দেশজুড়ে এত বড় মাপের একটি সফল ছাত্র আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর সাধারণ মানুষের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিজিত দীপক তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের আপামর ছাত্রসমাজের বিপুল প্রত্যাশা পূরণে সিজেপির সাংগঠনিক দায়িত্ব ও কর্তব্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দলের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে খুব শিগগিরই তাদের দলের সাংগঠনিক পরিসর ও পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হবে।