এরই মধ্যে নয়াদিল্লিতে একটি ভার্চ্যুয়াল মতবিনিময় সভায় তার অংশগ্রহণের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার পক্ষ থেকে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তবে এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ভারত সরকার নিজেদের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার করেছে।
নয়াদিল্লি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওই গণমাধ্যম অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার সঙ্গে ভারত সরকারের ন্যূনতম কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মঙ্গলবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দেশটির মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সামনে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ব্রিফিংকালে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, যে অনুষ্ঠানের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি সম্পূর্ণভাবে একটি বেসরকারি গণমাধ্যম সংস্থার নিজস্ব আয়োজন।
এর সঙ্গে রাষ্ট্রের বা সরকারের নীতিগত কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ওই নির্দিষ্ট ফোরামে যদি কোনো ব্যক্তি তার নিজস্ব মতামত বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেন, তবে তার দায়ভার একান্তই সেই ব্যক্তির। ভারত সরকার কখনোই সেই মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করে না বা তা সমর্থন করে না।
মূলত, দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের পরিচিত সংগঠন ‘ফরেইন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’ (এফসিসি) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, যেখানে শেখ হাসিনার ভাষণ দেওয়ার একটি পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত বছর অপ্রত্যাশিত গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ঢাকা থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনা সেখানেই অবস্থান করছেন। সম্প্রতি তার এই ভার্চ্যুয়াল ভাষণের খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে নিজেদের গভীর উদ্বেগ ও আপত্তির কথা পৌঁছে দেয়।
কূটনৈতিক মাধ্যম ব্যবহার করে ঢাকা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়েছে যে, এ ধরনের কোনো রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমভিত্তিক আয়োজন দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক ইতিবাচক গতিধারায় অনাকাঙ্ক্ষিত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে গত সোমবার ঢাকায় একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ওই বৈঠকে ঢাকার উদ্বেগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
অন্যদিকে, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার বিষয়েও সংবাদ ব্রিফিংয়ে আলোকপাত করা হয়। একটি প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান যে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তারেক রহমানকে ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
এই আমন্ত্রণ দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার একটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার। এর পাশাপাশি আসন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর প্রেক্ষাপটে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাতের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন।
এই মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক আয়োজনের বিষয়ে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে অতিথি আমন্ত্রণের যে আন্তর্জাতিক ও প্রচলিত নিয়ম রয়েছে, ঠিক সেই শিষ্টাচার মেনেই এই চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক জোটের প্রধানদেরও একইভাবে এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের এই আমন্ত্রণের বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতের পাঠানো এই সম্মানজনক আমন্ত্রণপত্রটি ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে।
তবে এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য চিঠিটি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই আমন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার সম্পূর্ণরূপে প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত থাকলেও, বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে এই আমন্ত্রণটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আগামী ২০২৭ সালে আঞ্চলিক জোট বিমসটেক তার প্রতিষ্ঠার গৌরবময় ৩০ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে এবং সেই ঐতিহাসিক বছরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় জোটটির পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের একটি প্রস্তাবিত পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে ব্রিকসের মতো বৃহত্তর বৈশ্বিক মঞ্চে বিমসটেকের প্রতিনিধিত্ব করার এই সুযোগ বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।