বৃহস্পতিবার পূর্বসাগর বা জাপান সাগর অভিমুখে পিয়ংইয়ংয়ের এই স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন কোরীয় উপদ্বীপ এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে নতুন করে সামরিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উত্তর কোরিয়া তাদের এই অত্যাধুনিক সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মূলত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে এবং পশ্চিমা বিশ্বকে একটি কঠোর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এই অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই ঘটনা একটি নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ বা জেসিএস বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তাদের সামরিক রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থায় স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটার দিকে উত্তর কোরিয়ার ওনসান এলাকা থেকে একটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর পরই সংবাদমাধ্যমগুলোকে পাঠানো এক জরুরি বার্তায় সিউল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তারা তাদের মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে এই নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট ধরন, এর সর্বোচ্চ পাল্লা, গতিপথ এবং ধ্বংসাত্মক সক্ষমতা নিয়ে নিবিড়ভাবে বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, বিতর্কিত এই ক্ষেপণাস্ত্রটি পূর্ব সাগরের দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে জাপান সাগর নামেই সমধিক পরিচিত।
টোকিওর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও এই উৎক্ষেপণের বিষয়টি নিজস্ব অবস্থান থেকে নিশ্চিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক বার্তায় জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ওই জাতীয় কোনো বিপজ্জনক সমরাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
তবে পরবর্তীতে টোকিও প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কারণে জাপানের মূল ভূখণ্ড বা উপকূলীয় অঞ্চলে কোনো ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়েনি এবং এটি জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে পতিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও এই ঘটনা জাপানের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি একটি সুস্পষ্ট হুমকি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
এই ঘটনার পূর্বাপর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উত্তর কোরিয়া ২০১৯ সাল থেকেই নিজেদের একটি সম্পূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করে আসছে।
পিয়ংইয়ংয়ের এই অনড় অবস্থানের কারণে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তিরক্ষা প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাপান সরকার তাদের বার্ষিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উত্তর কোরিয়ার এই অব্যাহত ও ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক অস্ত্র এবং আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে।
জাপানের বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি চলতি সপ্তাহে এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বিবৃতিতে স্পষ্টতই বলেছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক জরুরি পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করে জাপানের সামরিক বাহিনীকে আরও আধুনিক, সুসজ্জিত ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
মূলত জাপানের এই পরিবর্তিত ও আগ্রাসী প্রতিরক্ষা নীতির কারণেই পিয়ংইয়ং এমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। জাপানের এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ঘোষণার পরপরই উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে গত বুধবার একটি অত্যন্ত কড়া বিবৃতি প্রকাশিত হয়।
উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন ও দেশটির নীতিনির্ধারক কিম ইয়ো জং সেই বিবৃতিতে সরাসরি সতর্ক করে বলেন যে, পিয়ংইয়ংয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার্থে অতিরিক্ত সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পিছপা হবে না।
তাঁর এই মন্তব্যটি যে স্পষ্টতই জাপানের সাম্প্রতিক সামরিক রূপান্তর ও সমরাস্ত্র বৃদ্ধির সরাসরি প্রতিক্রিয়া, তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলের কাছে একেবারেই পরিষ্কার। এদিকে উত্তর কোরিয়ার এই আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করেছে।
সিউলের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, সম্ভাব্য যেকোনো অতিরিক্ত উৎক্ষেপণ বা সামরিক উসকানি মোকাবিলায় তারা নজরদারি জোরদার করেছে এবং সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সাথে ত্রিদেশীয় নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় এই উৎক্ষেপণ সংক্রান্ত গোপনীয় ও সংবেদনশীল তথ্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিনিময় করা হচ্ছে।
চলতি আগস্ট মাসের শেষের দিকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়াকে কৌশলগত চাপে রাখতে এবং নিজেদের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা চূড়ান্তভাবে যাচাই করতে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক বৃহৎ যৌথ সামরিক মহড়া 'উলচি ফ্রিডম শিল্ড' আয়োজন করতে যাচ্ছে।
এই সামরিক মহড়াটি ওই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ একটি প্রস্তুতিমূলক সামরিক কার্যক্রম। উত্তর কোরিয়া বরাবরের মতোই মিত্র দেশগুলোর এ ধরনের যেকোনো যৌথ সামরিক মহড়ায় তীব্র ক্ষোভ ও কূটনৈতিক আপত্তি প্রকাশ করে আসছে।
পিয়ংইয়ং বরাবরই এই ধরনের মহড়াগুলোকে উত্তর কোরিয়া আক্রমণের চূড়ান্ত পূর্বপ্রস্তুতি বা আগ্রাসনের মহড়া হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে। এই উত্তপ্ত ও সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় সিউলের জেসিএস বৃহস্পতিবার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছে যে, তাদের সমন্বিত সামরিক বাহিনী যেকোনো ধরনের আকস্মিক আগ্রাসন বা উসকানিমূলক তৎপরতার অত্যন্ত কঠোর, দ্রুত ও সমুচিত জবাব দেওয়ার মতো সক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের সামরিক প্রস্তুতি সার্বক্ষণিকভাবে বজায় রাখছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন কোরীয় উপদ্বীপের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে গভীর মনোযোগের সাথে নজর রাখছে।