শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মায়ের চেহারায় লজ্জিত হয়ে বিয়েতে না ডাকায় কর্মীকে বরখাস্ত করলেন চীনের কম্পানি প্রধান

RNS News

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম

মায়ের চেহারায় লজ্জিত হয়ে বিয়েতে না ডাকায় কর্মীকে বরখাস্ত করলেন চীনের কম্পানি প্রধান
ছবি : Collected

চীনের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানের মালিক তার এক কর্মীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছেন। কারণ হিসেবে জানা গেছে, ওই কর্মী নিজের মায়ের বাহ্যিক উপস্থিতি নিয়ে লজ্জিত ছিলেন এবং এই কারণে তিনি নিজের বিয়েতে জন্মদাত্রী মাকে আমন্ত্রণ জানাননি।

 

 

এই স্পর্শকাতর ও ব্যতিক্রমী ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে তুমুল আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যেমন নিয়োগকর্তার এই নৈতিক অবস্থানকে অনেকেই সাধুবাদ জানাচ্ছেন, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনের হস্তক্ষেপ নিয়েও উঠছে নানান প্রশ্ন।

 

 

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চীনের হিনান প্রদেশের সিনশিয়াং শহরের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান ‘হিনান কুয়াংশান ক্রেন কম্পানি’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান ছুই পেইজুন। অনলাইনে তিনি ইতোমধ্যে ‘চীনের সবচেয়ে উদার বস’ বা দয়ালু নিয়োগকর্তা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি ও সম্মান অর্জন করেছেন।

 

প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রতি তার উদারতার প্রমাণ পাওয়া যায় তার নানা পদক্ষেপে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তিনি কর্মীদের মাঝে ছয় কোটি ইউয়ান নগদ অর্থ বোনাস হিসেবে প্রদান করেন, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ৮৮ লাখ ডলারের সমতুল্য।

 

শুধু তাই নয়, গত বছরের শেষের দিকে কর্মীদের প্রদান করা মোট বোনাসের পরিমাণ ছিল ১৮ কোটি ইউয়ানেরও বেশি। ছুই পেইজুন মনে করেন, কর্মীদের পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক বেতন প্রদান করা হলে তরুণ সমাজ তাদের বাসস্থান ও গাড়ির ঋণ পরিশোধের চাপ থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকতে পারবে।

 

এছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ২০০৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তিনি নিম্ন আয়ের পরিবারের চার হাজার আটশর বেশি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে তিন কোটি পঞ্চাশ লাখ ইউয়ানের বেশি আর্থিক অনুদান প্রদান করেছেন।

 

সম্প্রতি স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যম দাসিয়াং নিউজ-এর প্রতিবেদনে এই বরখাস্তের ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। গত ২১ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি তাদের কর্মীদের ৩৩১ জন সন্তানকে নিয়ে একটি বিশেষ গ্রীষ্মকালীন ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করে।

 

ওই কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে ছুই পেইজুন বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব, কর্তব্য এবং সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন যে, বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাই হলো একজন প্রকৃত ও ভালো মানুষ হয়ে ওঠার প্রধান ভিত্তি।

 

 

বক্তব্য চলাকালেই তিনি তার প্রতিষ্ঠানের ওই কর্মীর কথা উল্লেখ করেন, যাকে তিনি নৈতিক স্খলনের কারণে বরখাস্ত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ছুই পেইজুন জানান, ওই কর্মী নিজের মায়ের চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগে তাকে নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণটুকুও জানাননি।

 

ছুই ওই কর্মীকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন যে, মাত্র দুই বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর যে মা তাকে এত কষ্ট করে বড় করেছেন, সেই মায়ের সঙ্গে সে কীভাবে এমন অমানবিক আচরণ করতে পারে? এই ঘটনার পরপরই তিনি ওই কর্মীকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করেন।

 

জানা যায়, চাকরিচ্যুত হওয়ার পর ওই কর্মী অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ জোটাতে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় ছুই পেইজুনের কাছে ফিরে আসেন। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং চাকরিটি ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। কিন্তু ছুই নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এমন মানসিকতার মানুষের প্রতি তার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই এবং তাকে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যেতেই হবে।

 

তবে এখানেই ঘটনার শেষ নয়। বরখাস্তকৃত কর্মীর মা যেন বৃদ্ধ বয়সে কোনো ধরনের আর্থিক কষ্টে না ভোগেন এবং সন্তানের অবহেলার শিকার হয়ে অসহায় হয়ে না পড়েন, সেই চিন্তায় ছুই পেইজুন এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

 

ওই নারী যখন তার পূর্বের কাজ থেকে অবসরে যান, তখন ছুই তাকে নিজের কম্পানির সরবরাহ বিভাগে একটি সম্মানজনক চাকরিতে নিয়োগ দেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাকে তার ছেলের পূর্বের বেতনের সমপরিমাণ অর্থই পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া শুরু হয়। যদিও এই পুরো ঘটনা নিয়ে ওই নারী প্রকাশ্যে কোনো ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন।

 

এই সংবেদনশীল ঘটনাটি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। চীনের মূল ভূখণ্ডের সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে খবরটি দুই কোটি চল্লিশ লাখেরও বেশিবার দেখা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ এটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

 

বহু নেটিজেন ছুই পেইজুনের এই কঠিন অথচ নৈতিক সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু মূল্যবোধ থাকে এবং এই সিদ্ধান্ত সেই মূল্যবোধেরই প্রতিফলন। একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, যে ব্যক্তি নিজের জন্মদাত্রী বাবা-মাকে ভালোবাসতে পারে না, সে অন্য মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কেবল অভিনয়ই করতে পারে; এমন কর্মীকে ছাড়াই প্রতিষ্ঠান অনেক ভালো চলবে।

 

আরেকজন লিখেছেন, কাজের দক্ষতা যে কাউকে শেখানো সম্ভব, কিন্তু কৃতজ্ঞতাবোধ এবং বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হলো সত্যিকারের মানুষ হওয়ার সবচেয়ে মৌলিক ও অপরিহার্য মানদণ্ড।

 

বিপরীত দিকে, অনেকেই এই ঘটনার সমালোচনা করে প্রশ্ন তুলেছেন যে, একজন নিয়োগকর্তার কি তার কোনো কর্মীর একান্তই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নৈতিকতার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রয়েছে? সমালোচনাকারীদের একজন মন্তব্য করেন, একটি কম্পানি অবশ্যই তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ প্রচার করতে পারে, তবে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের আচরণের বিষয়টি একেবারেই ব্যক্তিগত একটি ব্যাপার।

 

 

কর্মী যদি কর্মক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব ও কাজ সঠিকভাবে পালন করে থাকেন, তবে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা সরাসরি শ্রম অধিকারের চরম লঙ্ঘন। অন্য একজন ব্যবহারকারী জোর দিয়ে বলেন, একটি সত্যিকারের সভ্য ও আধুনিক সমাজে প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কখনোই নৈতিক বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া উচিত নয়; সমাজের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একমাত্র দায়িত্ব হলো প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থার।