শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল নয়াদিল্লি

হাসিনার সাম্প্রতিক মন্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

হাসিনার সাম্প্রতিক মন্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই
ছবি : Collected

বাংলাদেশের তীব্র আপত্তি ও প্রবল ক্ষোভের মধ্যেই গত ৫ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

 

তবে ওই বিতর্কিত ঘটনার ঠিক দুই দিন পর, শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে ভারত সরকারের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই।

 

বিশেষ করে, বাংলাদেশের বর্তমান বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে করা কোনো মন্তব্যকেই নয়াদিল্লি প্রশ্রয় দেয় না বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছে। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল।

 

এ সময় একজন সাংবাদিক শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে বসে কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং এর ফলে সৃষ্ট কূটনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। এই প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত সতর্ক, পরিমিত ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

 

রণধীর জয়সোয়াল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দাবি করেন, শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণভাবে একটি বেসরকারি উদ্যোগ ছিল। একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই মতবিনিময় সভায় ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো ধরনের ইন্ধন, সহযোগিতা বা অবদান ছিল না।

 

তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এটিকে কোনোভাবেই ভারত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রতিবেশীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করে ভারতের এই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আরও জানান যে, ওই দিনের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কিংবা অন্য আলোচকরা যেসব মন্তব্য করেছেন, তার প্রতি ভারতের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন বা সায় নেই।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর সামনে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট করেন, ওই অনুষ্ঠানে ব্যক্ত করা কোনো ব্যক্তিগত মতাদর্শ বা রাজনৈতিক বক্তব্যকে ভারত সরকার কোনোভাবেই সমর্থন করে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের বর্তমান আইনানুগ ও বৈধভাবে গঠিত সরকার কাঠামোর বিরুদ্ধে করা কোনো মন্তব্য নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

এর মাধ্যমে ভারত মূলত বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি তাদের কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে, যা এই দুই নিকট-প্রতিবেশীর ভবিষ্যৎ সুসম্পর্কের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

এদিকে, একই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের করা একটি বিতর্কিত মন্তব্যের বিষয়েও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। গত ৫ আগস্ট সজীব ওয়াজেদ মন্তব্য করেছিলেন যে, ভারতের পূর্ব দিকের প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি অর্থাৎ বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের মতো একটি চরম অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে এবং সেখানে খুব দ্রুতগতিতে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটছে।

 

এমন উদ্বেগজনক মন্তব্যের বিষয়ে ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি কী এবং নয়াদিল্লি এই সামগ্রিক পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করছে, তা জানতে চান উপস্থিত অপর এক সাংবাদিক। এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সোয়াল ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা নীতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন।

 

উত্তরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে জানান যে, ভারত সবসময়ই তার নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির ওপর অত্যন্ত গভীর ও সতর্ক নজর রাখে।

 

বিশেষ করে, যেসব ঘটনার সঙ্গে ভারতের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে, সেসব বিষয়ে নয়াদিল্লি সর্বদা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি যদি ভারতের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য বিন্দুমাত্র হুমকি হিসেবে দেখা দেয়, তবে তা মোকাবিলায় ভারত সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পিছপা হয় না।

 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত একদিকে যেমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, অন্যদিকে নিজেদের জাতীয় অখণ্ডতা, ভূখণ্ডগত নিরাপত্তা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় যেকোনো সম্ভাব্য ঝুঁকি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার বিষয়েও নিজেদের দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থানের কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।