শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী কে এই মেধাবী ও আলোচিত নিধি তিওয়ারি?

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী কে এই মেধাবী ও আলোচিত নিধি তিওয়ারি?
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পেশাগত পরিচিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মাঝে সব সময়ই এক ধরনের গভীর কৌতূহল কাজ করে।

 

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আস্থাভাজন ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নিধি তিওয়ারি নামের এক প্রতিভাময়ী নারীকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও সাফল্যের কাহিনী নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

 

এর পর থেকেই নিধি তিওয়ারির বিস্ময়কর পরিচয় ও নিরলস পরিশ্রমের গল্প আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হচ্ছে। নিধি তিওয়ারি মূলত ভারতীয় পররাষ্ট্র সেবার একজন দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তা।

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার পূর্বে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে উপসচিব হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। উপসচিব হিসেবে তাঁর মূল কাজের পরিধি ছিল ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত জটিল বিষয় বিশ্লেষণ করা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিকগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

 

তবে তাঁর পেশাগত জীবনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিকটি হলো, তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদানের আগে নিধি ভারতের সম্মানজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ভাবা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র’-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

 

দেশের অন্যতম পারমাণবিক বিজ্ঞানী থেকে প্রশাসনিক দপ্তরে তাঁর এই উত্তরণ নারী সমাজের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। এই মেধাবী ও দূরদর্শী নারীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রাজধানী লখনৌ শহরে। শৈশব থেকেই তিনি পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন।

 

নিজের জন্মস্থান লখনৌ শহরেই তিনি তাঁর বিদ্যালয়ের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক গণ্ডি পার করেন এবং সেখান থেকেই স্নাতক স্তরের পড়াশোনা কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেন। বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল অনুরাগের কারণে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ঐতিহ্যবাহী বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

 

সেখানে তিনি প্রাণরসায়ন বা বায়োকেমিস্ট্রি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এই অনবদ্য ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মানজনক স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।

 

শিক্ষাজীবন অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সমাপ্ত করার পরপরই নিধি তিওয়ারি ভাবা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে একজন নবীন বিজ্ঞানী হিসেবে নিজের পেশাগত জীবন শুরু করেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল বিস্তৃত পরিসরে দেশ ও জনগণের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করা।

 

সরকারি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নিজেকে যুক্ত করার অদম্য বাসনা থেকে ২০০৮ সালে তিনি বিজ্ঞানীর মতো আর্থিকভাবে নিশ্চিত পেশা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেন। এরপর তিনি ভারতের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক সিভিল সার্ভিস বা কেন্দ্রীয় জনসেবা কমিশনের পরীক্ষার জন্য নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করতে শুরু করেন।

 

কঠোর অধ্যবসায়ের পর ২০১২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সে বছর তিনি চূড়ান্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় স্থান না পেয়ে অপেক্ষমাণ তালিকায় থেকে যান।

 

তবে জীবনের এই সাময়িক বাধা তাঁকে তাঁর লালিত স্বপ্ন থেকে বিন্দুমাত্র দূরে সরাতে পারেনি। তিনি হতাশ না হয়ে বরং প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তাঁর এই অদম্য মানসিকতা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে ২০১৩ সালেই তিনি ভারতের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সরকারি চাকরির জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন।

 

এই পরীক্ষায় ছিয়ানব্বই নম্বর অর্জন করার কারণে তাঁকে মেধার ভিত্তিতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা হিসেবে পদায়নের জন্য মনোনীত করা হয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বর্ণাঢ্য কূটনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের অসাধারণ দক্ষতা ও বিচক্ষণতা প্রমাণের পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে নিধি তিওয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একজন অধীনস্থ সচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন।

 

কাজের ধরন ও অসামান্য প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে খুব দ্রুতই তিনি উপসচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছেন।

 

অজিত দোভালের নেতৃত্বে তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা সম্পর্কিত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত বিষয়গুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। একজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ধাপে ধাপে কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক নীতিনির্ধারণের পর প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে তাঁর এই অর্জন প্রমাণ করে যে, একাগ্রতা ও নিরলস অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো কঠিন লক্ষ্যকেই সফলভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।

 

- এনডিটিভি