এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের জন্য প্রতারক চক্রটি পাঁচ হাজার চারশ ছত্রিশটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছে বলে পুলিশের বিস্তৃত তদন্তে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রমাগত অভিযানের মুখে অভিযুক্ত ওই ইনফ্লুয়েন্সার আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। পুলিশি তদন্তের নথিপত্র অনুযায়ী, নজিরবিহীন এই সাইবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন পুনে শহরের এক প্রবীণ নাগরিক। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে।
সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধী চক্রের কয়েকজন সদস্য নিজেদের ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ওই বৃদ্ধের সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে ওই বৃদ্ধকে একটি গুরুতর আইনি মামলায় অভিযুক্ত করার ভয় দেখায়।
শুধু তাই নয়, তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হবে এবং সামাজিকভাবে চরম হেনস্তা করা হবে-এমন ভিত্তিহীন হুমকি দিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলা হয়। আইনি জটিলতা এবং পুলিশি হয়রানির এই কল্পিত পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রদান করতে হবে বলে চক্রটি জোরালো দাবি জানায়।
শেষ পর্যন্ত মানসিক চাপের মুখে বাধ্য হয়ে ওই প্রবীণ নাগরিক প্রতারকদের নির্দেশিত বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ধাপে ধাপে দশ কোটি চুয়াত্তর লাখ রুপি স্থানান্তর করেন। পরবর্তী সময়ে পুরো বিষয়টি যে একটি নিখুঁত প্রতারণার ফাঁদ ছিল, তা ওই ভুক্তভোগী বৃদ্ধ বুঝতে সক্ষম হন।
তিনি কালক্ষেপণ না করে পুনে পুলিশের সাইবার অপরাধ দমন বিভাগের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অত্যন্ত গোপনীয়তা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশের হাতে প্রথম সূত্রটি ধরা পড়ে যখন প্রতারক দলের এক মাঠপর্যায়ের সদস্য একটি স্বয়ংক্রিয় টেলার মেশিন (এটিএম) থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন করার চেষ্টা করছিল। পুনে পুলিশের একটি চৌকস দল তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেপ্তারকৃত ওই ব্যক্তিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর বেরিয়ে আসতে শুরু করে মূল অপরাধীদের নাম। তার দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শহরের বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে হর্ষদ সুভাষ ধানতোল, সমর্থ সুরেশ দেশমুখ এবং অমর শিবাজি আত্তার্গী নামের আরও তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে হর্ষদ সুভাষ ধানতোল পুলিশি জেরার মুখে স্বীকার করেন যে, তিনি এটিএম থেকে ভুক্তভোগীদের প্রতারিত করা নগদ অর্থ উত্তোলন করে সরাসরি রোহান যাদবের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
এই তথ্যের সূত্র ধরে তদন্তকারী কর্মকর্তারা রোহান যাদবের আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে শুরু করেন। আর তখনই বেরিয়ে আসে প্রতারণার এক বিশাল ও অতি-জটিল নেটওয়ার্কের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ওই বৃদ্ধের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া দশ কোটি চুয়াত্তর লাখ রুপি কোনো একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত রাখা হয়নি। বরং তদন্তকারী সংস্থাকে বিভ্রান্ত করতে এবং অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করতে রোহান যাদব অত্যন্ত সুচতুরভাবে এই বিপুল অর্থ মোট পাঁচ হাজার চারশ ছত্রিশটি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেছিলেন।
তদন্তের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে এই দেশীয় প্রতারণার সঙ্গে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্রের যোগসূত্রও পুলিশের নজরে আসে। পুলিশি অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত রোহান যাদব জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন টেলিগ্রামের মাধ্যমে হংকংভিত্তিক একটি অপরাধী চক্রের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
ভিডিও কলের মাধ্যমে তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত গোপন আলোচনা হতো। ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, হংকংয়ে অবস্থানরত অজ্ঞাত ওই নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশনায় রোহান যাদব প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত ভারতীয় রুপিকে ডিজিটাল ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করতেন।
ভারত থেকে এভাবে অবৈধ উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ প্রেরণের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজের বিনিময়ে তিনি ওই আন্তর্জাতিক চক্রের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন লাভ করতেন বলে সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে রোহান যাদব পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও, তদন্তের জাল ক্রমশ গুটিয়ে আসার সাথে সাথে তার পালানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। পুলিশ একে একে তার নামে থাকা সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অন্যান্য আর্থিক উৎসগুলো সম্পূর্ণভাবে জব্দ করে।
কোনো উপায় না দেখে অবশেষে এই বিতর্কিত ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার নিজে থেকেই আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। উল্লেখ্য, রোহান যাদব কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং তিনি সেলিব্রিটি ম্যানেজমেন্ট বা তারকাদের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পেশার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
সমাজের বিভিন্ন স্তরে তার পরিচিতি ছিল, যা ব্যবহার করে তিনি এই সুবিশাল প্রতারণার জাল বুনেছিলেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ভারতের পুনে এবং পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড় এলাকার থানায় পৃথক দুটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুরো নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করতে পুলিশের অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।