শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতে বাধা দিলে ২০ লাখ মানুষের মহাসমাবেশের হুঁশিয়ারি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম

ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতে বাধা দিলে ২০ লাখ মানুষের মহাসমাবেশের হুঁশিয়ারি
ছবি : Collected

পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের সঙ্গে দলীয় নেতাদের সাক্ষাতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে এবার অত্যন্ত কঠোর আন্দোলনের পথে হাঁটছে দলটি।

 

খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি কড়া ভাষায় বর্তমান সরকারকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ও সুযোগ দেওয়া না হলে, অন্তত বিশ লাখ মানুষের এক বিশাল গণসমাবেশ ঘটিয়ে সরকারকে চরম বার্তা দেওয়া হবে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলের এই বিপুল জনসমাগমের হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকারের জন্য এক নতুন এবং গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

গত বৃহস্পতিবার রাওয়ালপিন্ডির কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা আদিয়ালা কারাগারের বাইরে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এই চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি। তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, ২৭ সেপ্টেম্বরের আগে তিনি আর কোনোভাবেই আদিয়ালা কারাগারে যাবেন না।

 

তার ভাষায়, এটিই ছিল তার শেষবারের মতো কারাদর্শন প্রচেষ্টা। এরপর কেবল সরকার যদি নিজে থেকে বৈঠকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে এবং কারাফটক উন্মুক্ত করে, তবেই তিনি পুনরায় সেখানে উপস্থিত হবেন।

 

অন্যথায়, নিয়মতান্ত্রিক আবেদনের পথে না হেঁটে রাজপথের তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমেই কারাবন্দি দলীয় নেতার অধিকার আদায়ের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানান। আদিয়ালা কারাগারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও প্রশাসনের অসহযোগিতামূলক আচরণ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 

তিনি অভিযোগ করেন যে, কারা কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইমরান খানের সঙ্গে কাউকে দেখা করার ন্যূনতম সুযোগ দিতে চাইছে না। এ ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা অবলীলায় উপেক্ষা করা হচ্ছে।

 

আদালত প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুবার ইমরান খানের সঙ্গে তার আইনজীবী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সাক্ষাতের আইনি অনুমতি প্রদান করেছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না, বরং বারবার পিটিআই নেতা-কর্মী ও আইনজীবীদের কারাগারের ফটক থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

 

সোহেল আফ্রিদি এই পরিস্থিতিকে দেশের প্রচলিত আইন এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার ওপর এক নজিরবিহীন ও বড় ধরনের আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, আইনি অধিকার থেকে এভাবে বঞ্চিত করার পরিকল্পিত চেষ্টার পর রাজপথে নেমে তীব্র গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া দলের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।

 

সরকার ও প্রশাসনের এমন অনমনীয় আচরণের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক কর্মসূচির কথাও জানিয়েছেন এই জ্যেষ্ঠ পিটিআই নেতা। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যদি অবিলম্বে বৈঠকের অনুমতি দেওয়া না হয়, তবে দলের পূর্বঘোষিত ‘ডি-চক’ কেন্দ্রিক প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পিটিআইয়ের হাজার হাজার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করবেন।

 

তিনি জানান, গত রাত থেকেই এই অবরোধের সূচনা হয়েছে। জাতীয় পতাকা এবং দলীয় পতাকায় সজ্জিত হয়ে রাজপথে নেমে আসার জন্য সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন প্রাদেশিক এই মুখ্যমন্ত্রী।

 

তিনি মনে করেন, এই গণপ্রতিবাদ দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেবে। সেটি হলো, ২০২২ সালের এপ্রিলে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতার প্রতি যে অমানবিক ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে, তা পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণ কোনোভাবেই আর মেনে নেবে না।

 

পিটিআইয়ের গণমাধ্যম শাখার সরবরাহকৃত তথ্যানুযায়ী, এরই মধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ও অঞ্চলে প্রতিবাদ কর্মসূচি স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হতে শুরু করেছে। সাধারণ কর্মী ও সমর্থকেরা শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে জড়ো হয়ে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে এবং সরকারের নিপীড়নমূলক নীতির বিরুদ্ধে স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে তুলছেন।

 

মুখ্যমন্ত্রী আফ্রিদি তার দীর্ঘ বক্তব্যে দেশের সার্বিক শাসনব্যবস্থার এক করুণ ও হতাশাগ্রস্ত চিত্রও তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, এমনকি খোদ সরকারি দলের মন্ত্রীরাও এখন নিজেদের মধ্যে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, রাষ্ট্র এবং এর শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

এই স্বীকারোক্তি বর্তমান সরকারের চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যর্থতারই এক অকাট্য প্রমাণ বলে তিনি মনে করেন। পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ বর্তমানে যে সীমাহীন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার একটি দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান চায় তারা।

 

সোহেল আফ্রিদি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, এই গভীর খাদের কিনারা থেকে জাতিকে উদ্ধার করার সক্ষমতা একমাত্র ইমরান খানের নেতৃত্বেই রয়েছে। সাধারণ মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতেই আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর অন্তত বিশ লাখ সাধারণ মানুষ ও দলীয় সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে রাজধানী ইসলামাবাদের দিকে এক বিশাল পদযাত্রা শুরু করার ঘোষণা দেন তিনি।

 

তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেন যে, সরকারের এই স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে আর কোনোভাবেই নীরব থাকা সম্ভব নয়। প্রশাসন যদি এই পদযাত্রা বা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করে, তবে দেশব্যাপী চলমান কঠোর সড়ক অবরোধ কর্মসূচিকে আরও জোরদার করা হবে। পরিশেষে তিনি মন্তব্য করেন, আগামী ২৭ তারিখে ইসলামাবাদের রাজপথে এই অভূতপূর্ব গণপদযাত্রা বর্তমান শাসন কর্তৃপক্ষের জন্য এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।

 

- ডন