শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আফগানিস্তানে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ২৪ লাখ নারী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম

আফগানিস্তানে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ২৪ লাখ নারী
ছবি : Collected

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো সম্প্রতি আফগানিস্তানের নারী শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এই বৈশ্বিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ২০২১ সালে তালেবান গোষ্ঠী পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর থেকে আফগানিস্তানে অন্তত ২৪ লাখ মেয়ে তাদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত রয়েছে।

 

একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে এই বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া বা জোরপূর্বক দূরে সরিয়ে রাখা কেবল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই খবর প্রচার করেছে, যেখানে নারী শিক্ষার এমন করুণ চিত্র বিশ্ববিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ইউনেস্কোর ওই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আফগানিস্তানের সমাজ ও অর্থনীতির ওপর এই শিক্ষা নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

সংস্থাটি সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছে যে, তালেবান গোষ্ঠীর ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে এভাবে শিক্ষার আলো থেকে অন্ধকারে রাখার যে নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, তার ফলে দেশটির সার্বিক অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে এক অপূরণীয় ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতি সাধিত হবে।

 

পরিসংখ্যানগত দিক থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহতার দিকে এগোচ্ছে। ইউনেস্কোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কেবলমাত্র চলতি বছরেই আফগানিস্তানে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দুই লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

পরিস্থিতি যদি অপরিবর্তিত থাকে এবং মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ওপর আরোপিত এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নারীদের এই সংখ্যা ২৪ লাখ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪০ লাখে গিয়ে দাঁড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

 

আফগানিস্তানের বর্তমান এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর হতাশা ও চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউনেস্কোর ‘জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষা’ বিষয়ক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী হোদা জাবেরিয়ান।

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আফগানিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, বর্তমান বিশ্বে আফগানিস্তানই হচ্ছে একমাত্র দেশ, যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে মেয়ে ও নারীদের মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষার ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা রয়েছে।

 

শিক্ষার ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে তিনি আরও যুক্ত করেন যে, একজন শিশুর শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ পাঁচ বছরের এই বিরতিকে কোনোভাবেই সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এই সুদীর্ঘ সময় একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় পুরো একটি পর্যায় বা স্তরের সমতুল্য।

 

ফলে এই পাঁচ বছরের ক্ষতি কোনোভাবেই সহজে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক এই রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সংঘাতের একপর্যায়ে যখন পশ্চিমা সামরিক জোট তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়, ঠিক তখনই ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান গোষ্ঠী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।

 

ক্ষমতা দখলের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আফগান জনগণকে এই মর্মে সুস্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, নারীদের স্বাভাবিকভাবে তাদের পড়াশোনা ও অন্যান্য মৌলিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে দেওয়া হবে।

 

কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো ২০২২ সালের মার্চ মাসে এক আকস্মিক নির্দেশনার মাধ্যমে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল-শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর ঠিক কয়েক মাস পর, একই বছরের ডিসেম্বর মাসে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের ওপরও কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

 

তালেবান প্রশাসন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বারবার এই দুই সিদ্ধান্তকেই কেবল সাময়িক পদক্ষেপ বলে দাবি করলেও, আজ পর্যন্ত সেই নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করার কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

 

নিজেদের এই কঠোর নীতির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে তালেবান কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা প্রতিনিয়ত দাবি করে আসছেন যে, তারা মূলত ইসলামি আইন এবং আফগান সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ব্যাখ্যার আলোকেই নারীদের অধিকারকে সম্মান ও সুরক্ষা প্রদান করছেন।

 

তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র উঠে এসেছে। তারা বলছে, তালেবানের এই বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল মেয়ে ও নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই।

 

বরং কর্মসংস্থান, স্বাধীনভাবে চলাফেরা, এমনকি চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রেও আফগান নারীদের ওপর অকল্পনীয় সীমাবদ্ধতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান আফগানিস্তানে নারীদের জন্য উন্মুক্ত উদ্যান, শরীরচর্চা কেন্দ্র এবং রূপচর্চাকেন্দ্রে প্রবেশাধিকার পর্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

 

নারীদের সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে এভাবে সুপরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন করার এই সামগ্রিক ও কাঠামোগত ব্যবস্থাকে জাতিসংঘ ইতিমধ্যে ‘লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ’ হিসেবে কঠোর ভাষায় অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত চাপ ও নিন্দার পরও তালেবান প্রশাসন তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।

 

ক্ষমতা গ্রহণের পর দীর্ঘ পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই অব্যাহত ধারার কারণে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তালেবান সরকার এখনও প্রায় সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে আছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের কেবল একটিমাত্র দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান প্রশাসনকে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

 

বাকি বিশ্ব এই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে, যার চরম মূল্য প্রতিনিয়ত চোকাচ্ছে দেশটির লাখ লাখ নিরপরাধ নারী ও শিশু।