শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দীর্ঘ ৯ মাস পর কারাবন্দী ইমরান খানের সঙ্গে পরিবারের সাক্ষাৎ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম

দীর্ঘ ৯ মাস পর কারাবন্দী ইমরান খানের সঙ্গে পরিবারের সাক্ষাৎ
ছবি : Collected

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়ে অবশেষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পেলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান।

 

দীর্ঘ নয় মাসের নিঃসঙ্গ এবং কঠোর কারাবাসের পর সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ নির্দেশনায় এই মানবিক সুযোগটি লাভ করেন বাহাত্তর বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক। রাওয়ালপিন্ডির অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত আদিয়ালা কারাগারে অনুষ্ঠিত এই আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎটিতে উপস্থিত ছিলেন তার বোন নোরিন নিয়াজি এবং সহধর্মিণী বুশরা বিবি।

 

দেশটির শীর্ষ আদালতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে কারাবন্দী নেতার এই পারিবারিক পুনর্মিলন পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতি, মানবাধিকার কর্মী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

 

পাকিস্তানের শীর্ষ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই মূলত দীর্ঘ এই আইনি ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার অবসান ঘটে। সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত মানবিক দিক বিবেচনা করে কারাবন্দী ইমরান খানকে সপ্তাহে অন্তত একদিন তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার আইনি অনুমতি প্রদান করেছে।

 

আদালতের এই যুগান্তকারী আদেশের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরে প্রথমবারের মতো কারাবন্দী ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পান বোন নোরিন নিয়াজি। কারা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত কঠোর প্রোটোকল ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আদিয়ালা কারাগারের একটি সুনির্দিষ্ট আলোচনা কক্ষে এই বিশেষ সাক্ষাৎটি অনুষ্ঠিত হয়।

 

দীর্ঘ নয় মাস পর অনুষ্ঠিত ভাই-বোনের এই সাক্ষাতের জন্য কারা কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বরাদ্দ ছিল মাত্র পনেরো মিনিট। অত্যন্ত সীমিত এবং মহার্ঘ্য এই সময়ের মধ্যে মূলত ইমরান খানের বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং তার সাম্প্রতিক চিকিৎসাগত দিকগুলো নিয়েই তাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়।

 

একই সঙ্গে বোন নোরিন নিয়াজি তার কারাবন্দী ভাইকে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া সর্বশেষ নির্দেশনার বিষয়টিও বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন। এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, তার পূর্ণাঙ্গ শারীরিক পরীক্ষা ও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে অবিলম্বে ইসলামাবাদের সুপরিচিত এবং অত্যাধুনিক চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে।

 

তবে এই সাক্ষাতের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর শর্ত আরোপ করা ছিল। শীর্ষ আদালত আগেই স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছিল যে, পারিবারিক সাক্ষাতের এই সুযোগকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান বা কোনো ধরনের রাজনৈতিক বার্তার আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

 

যদি এই শর্তের কোনো রকম লঙ্ঘন হয়, তবে সাক্ষাতের এই আইনি সুবিধা অবিলম্বে বাতিল করা হতে পারে বলে বিচারকরা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। আদালতের এই সুস্পষ্ট নির্দেশনার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে সাক্ষাতের পর সংবাদমাধ্যমের সামনে নোরিন নিয়াজি কোনো ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্য করা বা বিবৃতি দেওয়া থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখেন।

 

তার এই সচেতন নীরবতা প্রমাণ করে যে, আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই তারা এই পারিবারিক সাক্ষাতের সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন এবং আদালতের প্রতি পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করেছেন। কারাগারের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো অত্যন্ত নিশ্ছিদ্র এবং কড়াকড়ি।

 

নিরাপত্তাজনিত স্পর্শকাতরতার কারণ দেখিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ সেদিন ইমরান খানের অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের সাক্ষাতের অনুমতি প্রদান করেনি। তার অপর দুই বোন আলিমা খান ও উজমা খান এবং ফুফাতো ভাই কাসিম জামান সাক্ষাতের আশায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের নিরাশ হতে হয়।

 

শুধু পরিবারের নির্দিষ্ট কয়েকজন সদস্যই নন, ইমরান খানের প্রতিষ্ঠিত দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের কোনো স্তরের নেতা বা কর্মীকেও সেদিন কারাগারের ত্রিসীমানায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

 

বোনের সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী তার স্ত্রী বুশরা বিবির সঙ্গেও একান্তে সাক্ষাতের সুযোগ পান। পাকিস্তানের স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আদিয়ালা জেলের একই আলোচনা কক্ষে স্বামী-স্ত্রীর এই সাক্ষাৎটি দীর্ঘায়িত হয়েছিল প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত।

 

উল্লেখ্য যে, ইমরান খানের স্ত্রী বুশরা বিবি নিজেও একই কারাগারে বন্দী জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘ এই বন্দী দশার মাঝে তিনিও সেদিন এক ভিন্নরকম স্বস্তি লাভ করেন। ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি বুশরা বিবি তার আগের সংসারের সন্তানদের সঙ্গেও মিলিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

 

তার সন্তান মুসা, মুবাশশারা মানেকা এবং মেয়ে জা মেহেরুন্নেসা দীর্ঘ বিরতির পর মায়ের সঙ্গে প্রায় চল্লিশ মিনিট সময় অতিবাহিত করেন, যা ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত আবেগপূর্ণ একটি মুহূর্ত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় এই নেতা ২০২৩ সাল থেকে একাধিক মামলার অভিযোগ মাথায় নিয়ে আদিয়ালা কারাগারে বন্দী জীবন অতিবাহিত করছেন।

 

বর্তমানে তিনি বহুল আলোচিত আল-কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করছেন। বয়সের ভারে এবং দীর্ঘ কারাবাসের কারণে সম্প্রতি তার শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

 

এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই সুপ্রিম কোর্ট তাকে দ্রুত শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের মাধ্যমে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রদান করেছে। আগামী ষোলোই সেপ্টেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে, এবং আশা করা হচ্ছে অন্তত সেই সময় পর্যন্ত হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে।

 

- সামা টিভি