আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মিনিটের মধ্যে পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল কাদা ও পলির স্রোত পুরো এলাকাকে আক্ষরিক অর্থেই এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় এক শোকাবহ এবং হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা ঠিক কতটা তীব্র ছিল, তা সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্য থেকে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাহাড়ের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ কালো কাদা, পলি ও পাথরের এক বিশাল দেয়াল প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং সেখানে অবস্থানরত পর্যটকরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের কাছে মানুষের সমস্ত প্রচেষ্টা যেন নিমিষেই ব্যর্থ হয়ে যায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সেই দানবাকৃতির কাদার দেয়াল সবকিছুকে গ্রাস করে নেয়। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বহু মানুষের অস্তিত্ব। ভয়াবহ এই দৃশ্য যেন বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃতির অসীম ক্ষমতার কাছে মানুষ কতটা অসহায়।
প্রাণহানির পাশাপাশি নিখোঁজ মানুষের দীর্ঘ তালিকা উদ্ধারকর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। নেপালের পর্যটন বোর্ডের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এই বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে অন্তত ৪০৩ জন ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি পর্যটক এবং ৬১ জন নেপালি নাগরিক রয়েছেন।
নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ভারতের সর্বাধিক ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ২৬টি ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০৩ জন পুরুষ এবং ২০০ জন নারী।
নিখোঁজের এই বিশাল সংখ্যা আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা হয়তো আরও অনেক বেশি হতে পারে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নেপাল পুলিশের অন্তত ২৬ জন সদস্য এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সাতজন সদস্যও এই প্রলয়ঙ্করী বন্যায় নিখোঁজ হয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি মর্মান্তিক করে তুলেছে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, এই মহাবিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে একটি প্রকাণ্ড তুষারধসকে দায়ী করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভয়াবহ সেই তুষারধসের কারণে স্থানীয় লেন্দে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
এর ফলে পানির প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে তা বিস্ফোরিত হয়ে ভোতেকোশি নদীতে এক প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যার জন্ম দেয়। লেন্দে মূলত ভোতেকোশি নদীরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনদী। পানির এই প্রবল স্রোত নেপালের নুয়াকোট এবং ধাদিং জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় নদীর তীরবর্তী বহু বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্পকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, সম্ভবত ওই অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোনো একটি মৃদু ভূমিকম্পের প্রভাবেই এই ভয়াবহ তুষারধস বা পাহাড়ধসের সূত্রপাত ঘটে থাকতে পারে।
বিপর্যয়ের এই ভয়াল থাবা কেবল নেপালের সীমানাতেই আটকে থাকেনি, বরং প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অংশেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, মূলত নেপাল ও চীন সীমান্তেই এই প্রলয়ঙ্করী ভূমিধসের ঘটনাটি ঘটেছে।
এর সরাসরি আঘাত গিয়ে পড়েছে সীমান্তবর্তী জিরং বা গিরং বন্দরে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে নেপাল সীমান্তবর্তী চীনের শিগাতসে অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তিব্বতের স্থানীয় কর্মকর্তারাও এই ঘটনার পর ওই অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বর্তমানে দুর্যোগকবলিত অঞ্চলগুলোতে এক শ্বাসরুদ্ধকর এবং চরম প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে উদ্ধারকাজ পরিচালিত হচ্ছে। রসুয়া জেলার স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যে এই ঘটনাকে একটি ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে এবং প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নিরূপণ করতে নেপাল সেনাবাহিনী জরুরি ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে একাধিক হেলিকপ্টার এবং বিশেষ দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যদের মোতায়েন করেছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলমান রয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষগুলোকে জীবিত উদ্ধারের আশা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীণ হয়ে আসলেও, উদ্ধারকর্মীরা এখনো তাদের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
হিমালয়ের কোলে অবস্থিত নেপাল ভৌগোলিকভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। কিন্তু এবারের এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস অতীতের অনেক ভয়াবহ স্মৃতিকে ছাপিয়ে গেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকা রসুয়া জেলা এখন শুধুই স্বজনহারা মানুষের কান্না আর ধ্বংসস্তূপের এক বিরানভূমি।
দুই দেশের কর্তৃপক্ষই আশঙ্কা করছে যে, হতাহতের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়তে পারে। এখন কেবল অপেক্ষার পালা, নিখোঁজ মানুষগুলোর ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানার এবং প্রকৃতির এই ভয়াল ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামের।