শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি হাজার ছাড়াল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি হাজার ছাড়াল
ছবি : Collected

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত প্রতিবেশী দুই ভূখণ্ড নেপাল ও চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতে আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা এএফপি দুই দেশের সরকারি কর্তৃপক্ষের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে এই মর্মান্তিক সংবাদ প্রকাশ করেছে।

 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত সর্বমোট এক হাজার তিনজনের প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ডে এখন পর্যন্ত ৯৮৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে চীন সরকার। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর তাণ্ডবে হিমালয় অববাহিকার জনজীবনে নেমে এসেছে এক অবর্ণনীয় শোক ও হাহাকার। গত বুধবার নেপালের রাসুয়া জেলার ভোটেকোশি নদীতে হঠাৎ করেই এই প্রলয়ংকরী বন্যার সূত্রপাত হয়।

 

পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা এতই ভয়াবহ ছিল যে, নদীর দুই কূল ছাপিয়ে বিপুল বেগে ধেয়ে আসা জলের স্রোত মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। জলের প্রচণ্ড শক্তি ও গতির কারণে বহু মানুষের মৃতদেহ উৎপত্তিস্থল থেকে ভেসে কয়েকশো মাইল দূরের অপরিচিত লোকালয়ে গিয়ে ঠেকেছে।

 

পাহাড়ি নদীর এই রুদ্রমূর্তি স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের কোনো ধরনের প্রস্তুতির সুযোগই দেয়নি। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয়ে অসংখ্য ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উদ্ধার কার্যক্রম।

 

ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর আজ মঙ্গলবার সপ্তম দিনের মতো বিরামহীনভাবে চলছে উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপ ও কাদাপানির নিচ থেকে ৯৮৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো বেশ কিছু মানুষকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

 

ফলশ্রুতিতে দেশটিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমে বর্তমানে তিন হাজার ৯১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে, চীনের তিব্বত অঞ্চলে এখনো ৫৪৬ জন মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে দুই ভূখণ্ডে মোট নিখোঁজ রয়েছেন চার হাজার ৪৬২ জন মানুষ।

 

নিখোঁজ এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে প্রবল উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। যেহেতু এখনো প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, তাই উদ্ধারকারী দল ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, আগামী দিনগুলোতে নিহতের এই সংখ্যা আরও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

এই আকস্মিক বন্যা শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদেরই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসংখ্য পর্যটককেও চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যারা বিশ্বের অন্তত ৩০টি ভিন্ন দেশ থেকে হিমালয়ের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছিলেন।

 

একইভাবে চীনে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের এমন মর্মান্তিক পরিণতির কারণে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও পরিবারগুলোর মাঝে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলো পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিখোঁজ নাগরিকদের সন্ধানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।

 

এদিকে, উদ্ধারকৃত বিপুলসংখ্যক মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে নেপাল সরকার। দেশে পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাব থাকায় একসঙ্গে এত মৃতদেহ রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই তীব্র সংকটের মুখে বাধ্য হয়ে নেপাল কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত হৃদয়বিদারক অথচ বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

মৃতদেহগুলোতে পচন ধরার আগেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রতিটি লাশের ডিএনএ নমুনা সতর্কতার সঙ্গে সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে। এরপর মৃতদেহগুলোকে যথাযথ আনুষ্ঠানিকতা ও সম্মানের সঙ্গে সাময়িকভাবে গণকবরে সমাহিত করা হচ্ছে।

 

পরবর্তীতে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনার সঙ্গে নিখোঁজদের স্বজনদের ডিএনএ মিলিয়ে যখন মৃতদেহের পরিচয় বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, কেবল তখনই কবর থেকে অবশিষ্টাংশ উত্তোলন করে তা নিজ নিজ পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

 

হিমালয় অঞ্চলের এই অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় ভৌগোলিক স্পর্শকাতরতার বিষয়টিকে আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নিয়ে এসেছে। প্রকৃতির এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক রূপ প্রমাণ করে যে দুর্যোগ মোকাবিলায় পাহাড়ি অঞ্চলগুলো এখনো কতটা অরক্ষিত।

 

শোকের এই ভয়াবহ আবহে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের মানুষ এখন কেবল নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। গোটা বিশ্ব আজ এই বিশাল শোক ও মানবিক সংকটের মুহূর্তে হিমালয় অঞ্চলের বিপন্ন মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে এবং উদ্ধারকাজে দ্রুত সফলতার প্রার্থনা করছে।

 

- এএফপি