শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের জোরালো ঘোষণা দিলেন মোদি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের জোরালো ঘোষণা দিলেন মোদি
ছবি : File Photo

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে নানামুখী উত্তেজনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার প্রবল চাপ উপেক্ষা করেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বহুমুখীকরণের একটি অত্যন্ত জোরালো ও সাহসী আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

 

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যখন ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর তাদের চাপ প্রয়োগের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে নয়াদিল্লির এমন কৌশলগত অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

 

গত সোমবার কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের অত্যন্ত ব্যস্ত সূচির ফাঁকে ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন নরেন্দ্র মোদি।

 

সেখানেই তিনি দুই দেশের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নিজের সুস্পষ্ট অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই কূটনৈতিক আলোচনার মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইরান ও ভারতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের যে ঐতিহাসিক এবং পরীক্ষিত বন্ধুত্বের ভিত্তি রয়েছে, তা আগামী দিনগুলোতে আরও সুদৃঢ় করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক আদান-প্রদান আরও কীভাবে সম্প্রসারিত ও বহুমুখী করা যায়, সে বিষয়ে তিনি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার এই বার্তার মাধ্যমে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, ভারত তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে বদ্ধপরিকর।

 

ভারত ও ইরানের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে ব্যাপক ধস নেমেছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৭০৩ কোটি মার্কিন ডলার, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বাইরে গিয়ে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা অবিশ্বাস্যভাবে কমে মাত্র ১৬৩ কোটি ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

এর ওপর সম্প্রতি মার্কিন প্রশাসন 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট' নামক একটি নতুন ও অত্যন্ত আগ্রাসী অর্থনৈতিক কর্মসূচি চালু করেছে। এই কর্মসূচির অধীনে যারা ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে।

 

এমন একটি দমবন্ধ করা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের এই নতুন ঘোষণা নিঃসন্দেহে এক বিশাল ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে এবং এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি বড় চমক। এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি সংবাদমাধ্যমের কাছে নয়াদিল্লির সরকারি অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট করেছেন।

 

তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার সার্বিক বিষয় এবং এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবগুলো ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখছেন।

 

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে ইরানের সঙ্গে ভারতের যে সীমিত বাণিজ্য চলমান রয়েছে, তার সিংহভাগই মূলত বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার এই বিরূপ প্রভাব কীভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি ভবিষ্যতে কী দাঁড়াবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ওপর।

 

অন্যদিকে, ইরান ও ভারতের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্কের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো চাবাহার সমুদ্রবন্দর। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি মধ্য এশিয়া এবং আফগানিস্তানে ভারতের নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশের একটি অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে কাজ করে, যা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য অপরিহার্য।

 

এই সমুদ্রবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জানান যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরটির সার্বিক পরিচালনা ও উন্নয়নের বিষয়টি বর্তমানে নিবিড় পর্যালোচনার অধীন রয়েছে।

 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যৌথভাবে একটি টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি ও লাভজনক উপায় খুঁজে বের করার লক্ষ্যে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, যাতে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক বাধা এই প্রকল্পের গতি মন্থর করতে না পারে।

 

শীর্ষ এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছাড়াও আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। লোহিত সাগর ও এর আশপাশের অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

 

বিশেষ করে, বিভিন্ন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজে আকস্মিক হামলার শিকার হয়ে অন্তত ১৩ জন ভারতীয় নাবিকের মর্মান্তিক প্রাণহানির বিষয়টি তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করেন। আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরীহ বাণিজ্যিক জাহাজ এবং সাধারণ নাবিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর তিনি সর্বোচ্চ জোর দেন।

 

নরেন্দ্র মোদি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, যুদ্ধ, সংঘাত বা সামরিক আগ্রাসন কখনো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বয়ে আনতে পারে না; বরং যেকোনো জটিল আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান নিহিত রয়েছে গঠনমূলক আলোচনা এবং কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমে।

 

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী যুদ্ধনীতি ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার অত্যন্ত কঠোর ও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্বের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখার জন্য সামরিক সংঘাত নয়, বরং পারস্পরিক সম্মানজনক ও সমতাভিত্তিক কূটনীতিই হলো একমাত্র কার্যকর পথ।

 

কূটনৈতিক এই আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে আগামী দিনে অনুষ্ঠিতব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জোট ব্রিকস (বিআরআইসিএস) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ভারতে আসার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের তথ্যসূত্রে প্রাপ্ত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীর্ষ দুই নেতার এই বৈঠক এবং এর পরবর্তী ঘোষণাগুলো দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন এক মেরুকরণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

- দ্য ওয়ার