সোমবার, ৩১ আগস্ট ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রকাশিত এক বিশদ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, এই বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই ভয়াবহ ছিল যে এর প্রভাবে পার্শ্ববর্তী অত্যন্ত ব্যস্ত দিল্লি-হাওড়া রেলপথে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায় এক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলগুলোর নিবিড় ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় বর্তমানে ঘটনাস্থলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যাপক উদ্ধারকাজ চলমান রয়েছে। দুর্ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কৌশাম্বী জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অমিত পাল গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি তার বিবৃতিতে জানান, জেলার পিপরী থানা এলাকার অন্তর্গত মনোড়ী গ্রামে অবস্থিত ওই বাজি কারখানাটিতে আকস্মিকভাবে এই প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ঘটে। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের সহায়তায় প্রশাসন হতাহতদের দ্রুত উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী প্রয়াগরাজের এসআরএন হাসপাতালে প্রেরণ করে।
সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুরুতর আহত ১১ জন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এছাড়া মারাত্মকভাবে দগ্ধ ও আঘাতপ্রাপ্ত অপর পাঁচজন এখনো ওই একই হাসপাতালে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। চিকিৎসকরা তাদের জীবন বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিহতদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করার পর যে মর্মান্তিক চিত্র সামনে এসেছে, তা সমগ্র জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, অকালে প্রাণ হারানো সকলেই ওই কারখানা এবং এর নিকটবর্তী এলাকার সাধারণ বাসিন্দা।
এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো, নিহতদের মধ্যে একটি বড় অংশই হলো নিষ্পাপ শিশু, যাদের বয়স চার থেকে তেরো বছরের মধ্যে। প্রাণ হারানো এই শিশুদের মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছর বয়সী প্রিয়াঞ্জলী, তেরো বছরের প্রবীণ সিং, বারো বছরের জাহ্নবী ও আদিত্য, আট বছর বয়সী আরেক আদিত্য ও রবি, ছয় বছরের অংশ এবং মাত্র চার বছর বয়সী শিশু নানা।
এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বত্রিশ বছরের অঞ্জু, চল্লিশ বছরের জ্ঞান সিং এবং পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী বিক্রম সরোজ। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকর্মীদের প্রাথমিক ধারণা এবং শঙ্কা অনুযায়ী, এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে সর্বমোট আঠারো জনেরও বেশি মানুষ কমবেশি আহত হয়ে থাকতে পারেন।
মনোড়ী পাওয়ার হাউসের অতি সন্নিকটে ঘটা এই বিস্ফোরণের মাত্রা, তীব্রতা ও ধ্বংসক্ষমতা ছিল আক্ষরিক অর্থেই কল্পনাতীত। বিকট শব্দের এই প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণে কেবল মূল বাজি কারখানাটিই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়নি, বরং এর আশপাশে থাকা অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি বসতবাড়ি তাসের ঘরের মতো সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
বিস্ফোরণের প্রচণ্ড কম্পন ও চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসস্তূপের কারণে ওই এলাকার রেল যোগাযোগ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে আজমের-শিয়ালদহ এক্সপ্রেস ট্রেনটিকে মনোড়ী স্টেশনে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
একইসঙ্গে ভারতের অন্যতম অত্যাধুনিক ও দ্রুতগামী ট্রেন বন্দে ভারত এক্সপ্রেসকে সাইয়াদ সারওয়ান স্টেশনে জরুরিভিত্তিতে থামিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া, বিস্ফোরণের কারণে এলাকার মূল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সমগ্র জনপদ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক করতে নিরলসভাবে মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের ক্ষীণ আশায় একটি বিশাল ও সুদক্ষ উদ্ধারকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।
ভারতের জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ), ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ প্রশাসন এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর অর্ধশতাধিক বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত সদস্য অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে এই সমন্বিত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন।
ধসে পড়া ভবন ও কারখানার বিশাল কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ দ্রুত ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য দশটিরও বেশি বুলডোজার এবং অত্যাধুনিক খননযন্ত্র অবিরাম ব্যবহার করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ আটকে থাকতে পারে-এমন আশঙ্কায় প্রতিটি মুহূর্ত অমূল্য বিবেচনায় উদ্ধারকর্মীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিরামহীনভাবে তাদের উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই মর্মান্তিক, অনাকাঙ্ক্ষিত ও হৃদয়বিদারক প্রাণহানির ঘটনায় উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ অত্যন্ত গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর এই অপূরণীয় ক্ষতির মুহূর্তে তাদের প্রতি গভীর সহানুভূতি জানিয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তিনি জরুরি আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনায় নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে দুই লাখ রুপি এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসার সুবিধার্থে পঞ্চাশ হাজার রুপি করে এককালীন ক্ষতিপূরণ প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা স্থানীয় জনমনে গভীর শোকের ছায়া ফেলার পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় এমন বিপজ্জনক কারখানার অবস্থান এবং এর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সচেতন মহলে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।