শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইমরান খান ও বুশরা বিবিকে নির্জন কারাবাসে রাখা যাবে না!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১২ পিএম

ইমরান খান ও বুশরা বিবিকে নির্জন কারাবাসে রাখা যাবে না!
ছবি : Collected

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে কারাগারে একাকী বা নির্জন অবস্থায় বন্দি না রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন ইসলামাবাদ হাইকোর্ট।

 

একই সঙ্গে কারা বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে এই দম্পতির পরস্পরের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাতের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে আদালতের বিচারপতি খাদিম হুসাইন সোমরু এই আদেশ জারি করেন।

 

এর আগে গত ছয় আগস্ট এই সংক্রান্ত আবেদনগুলোর ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে রায় অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। আদালত তাঁর সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণে বেগম নুসরাত ভুট্টো এবং বেগম শামীম আফ্রিদি মামলার নির্ধারিত আইনি নীতির আলোকে বর্তমান আবেদনগুলোকে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

 

আদালতের রায়ে আদিয়ালা কারাগারের কারাধ্যক্ষকে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন ইমরান খান ও বুশরা বিবিকে প্রচলিত কারা আইন অনুযায়ী সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি, কারাবিধি মেনে তাঁদের পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গেও নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

 

এছাড়া, ইমরান খানকে তাঁর দুই ছেলের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার বিশেষ অনুমতি দিয়েছেন আদালত। তবে এই অনুমতির সঙ্গে একটি কঠোর শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আদালত সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যদি এই ফোনালাপের কোনো অংশ ধ্বনিমুদ্রণ বা ধারণ করে পরবর্তীতে তা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ফোনে কথা বলার এই সুবিধা পুরোপুরি বাতিল করা হবে।

 

এর বাইরে, এই দম্পতিকে প্রতিদিন সংবাদপত্র ও বই সরবরাহ করার পাশাপাশি প্রযোজ্য কারাবিধি অনুযায়ী তাঁদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুশরা বিবিকে যেন কোনোভাবেই একাকী কারাবন্দি করে রাখা না হয়, তা নিশ্চিত করতে আদিয়ালা কারাগারের প্রধান কর্মকর্তাকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পনেরো দিনের মধ্যে আদালতের এই নির্দেশ বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

 

ইমরান খানের বোন আলিমা খান এবং বুশরা বিবির কন্যা মুশাব্বারা খাওয়ার মানেকার দায়ের করা পৃথক আইনি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই রায় প্রদান করেছেন। আবেদনকারীদের মূল অভিযোগ ছিল, ইমরান খান এবং তাঁর স্ত্রীকে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে, যা তাঁদের মারাত্মক মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

আবেদনকারীদের আইনজীবী আদালতকে জানান, তাঁদের মক্কেলদের আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত এবং তাঁদের বই বা পত্রিকা পড়ার ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।

 

এই কঠোর বিধিনিষেধকে তাঁরা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করেন এবং নিয়মিত সাক্ষাতের পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার ফোনে কথা বলার সুযোগ দাবি করেন। তবে পূর্ববর্তী আইনি শুনানিতে পাকিস্তান সরকার এবং আদিয়ালা কারা কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছিল।

 

সরকারি কৌঁসুলিরা আদালতে দাবি করেছিলেন যে, ইমরান খানের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁর ওপর বিশেষ নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে। মূলত এই স্পর্শকাতর নিরাপত্তার স্বার্থেই তাঁকে অন্যান্য সাধারণ বন্দিদের থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। সরকার পক্ষের দাবি, তাঁকে কারাগারে খ-শ্রেণির বন্দিদের জন্য নির্ধারিত সুবিধার চেয়েও বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

 

আদিয়ালা কারাগারের কারাধ্যক্ষ আদালতকে জানিয়েছিলেন যে, ইমরান খানকে চব্বিশ ঘণ্টা কোনো একটি নির্দিষ্ট আবদ্ধ কক্ষে আটকে রাখা হয় না। বরং দিনের বেলায় তিনি সাতটি কক্ষ নিয়ে গঠিত একটি সুপরিসর চত্বরে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ পান।

 

বুশরা বিবির ক্ষেত্রেও কারা কর্তৃপক্ষ একই ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করে জানিয়েছিল যে, কেবল নিরাপত্তাজনিত কারণেই তাঁকে আলাদা রাখা হয়েছে, এটি কোনোভাবেই শাস্তিমূলক নির্জন কারাবাস নয়।

 

সম্প্রতি পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালে ইমরান খানের দুই ছেলের একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হওয়ার পর পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় একটি বিস্তারিত সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিদেশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে পাঠানো ওই বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় দাবি করে, ইমরান খানকে শাস্তিমূলক নির্জন কারাবাসে রাখা, তাঁর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা বা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

 

তথ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, কারাগারে তাঁর জন্য পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, ফোনে কথা বলা, পড়ার সামগ্রী এবং বাড়িতে রান্না করা খাবার সরবরাহের মতো সব ধরনের সুযোগ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়েছে।

 

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, তিনি কোনো নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে বিনা বিচারে আটক ব্যক্তি নন; বরং একাধিক বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত আইনি দণ্ডের ভিত্তিতেই তিনি কারাভোগ করছেন।

 

তবে পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সব ধরনের আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে বলে সরকার স্বীকার করেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দল সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই দাবিগুলোকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে একে সম্পূর্ণ বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেছে।