প্রকৃতির এই অভাবনীয় তাণ্ডবে দুই দেশ মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। এছাড়া এখনো চার সহস্রাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে কেবল সাধারণ কোনো বন্যা নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই এক প্রলয়ংকারী ‘হিমালয়ের সুনামি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।
স্থানীয় গণমাধ্যম কান্তিপুর টেলিভিশনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দুর্যোগের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, দুর্যোগের শুরুতে এটিকে সাধারণ মৌসুমি নদীর পানি বৃদ্ধির ঘটনা বলেই মনে করা হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত নোয়াখোট অঞ্চল সরেজমিনে পরিদর্শনের পর এই দুর্যোগের প্রকৃত ও ভয়ানক রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি উল্লেখ করেন, এই আকস্মিক বন্যায় পানির ঢেউগুলো প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ মিটার পর্যন্ত উঁচুতে আছড়ে পড়েছিল এবং তা প্রায় ঘণ্টায় একশত আশি কিলোমিটারের অবিশ্বাস্য গতিতে ধেয়ে আসে।
এটিকে ঘূর্ণিঝড় বা টর্নেডোর মতো চরম বিধ্বংসী এক বিপর্যয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের নেপালিদের জীবদ্দশায় এমন অভূতপূর্ব ও প্রলয়ংকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগ আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।
এদিকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি তথ্যে হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের ভূখণ্ডে এখন পর্যন্ত ৯৮৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে দুই দেশ মিলিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে এক হাজার তিনজনে গিয়ে পৌঁছেছে। মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি উদ্ধারকারী দলগুলো বেশ কিছু মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও নিখোঁজের তালিকা এখনো অত্যন্ত দীর্ঘ।
নেপালে বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন তিন হাজার ৯১৬ জন এবং তিব্বতে নিখোঁজ আছেন ৫৪৬ জন। সব মিলিয়ে দুই অঞ্চলে চার হাজার ৪৬২ জন মানুষ এখনো নিরুদ্দেশ রয়েছেন। আজ এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সপ্তম দিনেও উভয় দেশে অত্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকায় নিহতের এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে একটি বড় অংশই বিদেশি পর্যটক, যারা হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছিলেন।
নেপালে নিখোঁজদের তালিকায় বিশ্বের ত্রিশটি দেশের ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। অপরদিকে তিব্বত অঞ্চলে তেইশটি ভিন্ন দেশের ২৬১ জন বিদেশি পর্যটকের কোনো সন্ধান মিলছে না। আন্তর্জাতিক এই বিপুলসংখ্যক পর্যটক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার ও দূতাবাসগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
গত বুধবার নেপালের রসুয়া জেলার ভোটেকোশি নদী থেকে সৃষ্টি হওয়া এই আকস্মিক বন্যার পানির স্রোত এতটাই প্রচণ্ড শক্তিশালী ছিল যে, বহু মানুষের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে ভেসে কয়েকশত মাইল দূরে জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পৌঁছেছে।
বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের পর সেগুলো সংরক্ষণের জন্য নেপালে প্রয়োজনীয় হিমাগারের চরম সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ আপাতত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রতিটি মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে সাময়িকভাবে গণকবরে সমাহিত করার অত্যন্ত কঠিন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরবর্তীতে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের তথ্যের সঙ্গে সংগৃহীত ডিএনএ মিলিয়ে নিশ্চিত পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর কবর থেকে অবশিষ্টাংশ উত্তোলন করে তা যথাযথ মর্যাদায় স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
হিমালয় অববাহিকার ইতিহাসে এমন আকস্মিক জলপ্রবাহ ও প্রাণহানির ঘটনা বিরল। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশগত ভঙ্গুরতার বিষয়টি এই দুর্যোগের মাধ্যমে আরও একবার তীব্রভাবে সামনে এসেছে।
স্বজনহারা মানুষের হাহাকার আর নিখোঁজদের ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশায় পুরো অঞ্চল এখন এক গভীর শোকের সাগরে নিমজ্জিত। উদ্ধারকাজে গতি আনতে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ও এই মানবিক সংকটে নেপাল ও তিব্বতের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।