শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য কর্ণাটকের মন্ত্রীর

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম

ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য কর্ণাটকের মন্ত্রীর
ছবি : Collected

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন রাজ্য সরকারের বর্তমান উচ্চশিক্ষামন্ত্রী বাসবরাজ রায়ারেড্ডি। সাম্প্রতিক একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে ইসলাম ধর্মকে ‘অন্যান্য ধর্মের তুলনায় শ্রেষ্ঠ’ বলে মন্তব্য করে তিনি রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

 

তার এই মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তারা ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীর এই মন্তব্যকে সনাতন হিন্দুধর্মের জন্য চরম অবমাননাকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেছে এবং অবিলম্বে মন্ত্রী রায়ারেড্ডির পদত্যাগের জোর দাবি জানিয়েছে।

 

ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের আবহে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই কর্ণাটকের রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে প্রবল উত্তাপ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে।

 

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত রবিবার, ত্রিশে আগস্ট। এদিন কর্ণাটক রাজ্যের কোপ্পাল জেলার অন্তর্গত কুকনুর এলাকায় আয়োজিত একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই বিতর্কিত মন্তব্যটি করেন বাসবরাজ রায়ারেড্ডি।

 

ওই অনুষ্ঠানে তিনি ইসলাম ধর্মকে অত্যন্ত মানবিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন। উপস্থিত বিপুল সংখ্যক শ্রোতার উদ্দেশে তিনি বলেন যে, সঠিক জ্ঞানের অভাব এবং না জানার কারণেই সমাজের একটি বড় অংশ ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে নানাবিধ ভ্রান্ত ধারণা ও অহেতুক ভীতি পোষণ করে থাকে।

 

মন্ত্রী আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, ইসলাম ধর্ম মানুষকে মূলত সমাজে কীভাবে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে হয়, সেই সুমহান শিক্ষাই প্রদান করে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই, সূচনালগ্ন থেকেই মানবিকতার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার কারণে তিনি ইসলামকে অন্যান্য সকল ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে জনসমক্ষে নিজের মত প্রকাশ করেন।

 

জনসভায় নিজের ব্যক্তিগত ধর্মচর্চা, বিশ্বাস এবং পড়াশোনার পরিধি সম্পর্কেও অত্যন্ত অকপটে কথা বলেন কর্ণাটকের এই উচ্চশিক্ষামন্ত্রী। তিনি উপস্থিত জনতাকে জানান যে, প্রথাগতভাবে তিনি নিজে নিয়মিত কোনো মন্দির বা মঠে গিয়ে উপাসনা করেন না।

 

তবে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থগুলো নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে অত্যন্ত পছন্দ করেন। দীর্ঘদিনের এই গভীর অধ্যয়ন ও জ্ঞানানুশীলনের ফলেই মূলত ইসলামসহ অন্যান্য আব্রাহামিক ধর্মগুলোর প্রতি তার এক ধরনের বিশেষ আগ্রহ ও শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে বলে তিনি তার বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেন।

 

তবে মন্ত্রীর এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং নিজস্ব উপলব্ধিভিত্তিক বক্তব্যকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি রাজ্যের বিরোধী শিবির। বাসবরাজ রায়ারেড্ডির এই মন্তব্য গণমাধ্যমে আসার পরপরই ভারতীয় জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছে।

 

রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা এবং বিজেপির প্রবীণ রাজনীতিক আর অশোক কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া এবং উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় অশোক সরাসরি প্রশ্ন তোলেন যে, রাজ্যের কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের গভীর বিশ্বাস এবং মন্দির ও মঠের মতো পবিত্র স্থানগুলোকে প্রকাশ্যে হেয় করার পরও রাজ্য সরকার কীভাবে একেবারে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

 

এই উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। দলটির দাবি, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী বাসবরাজ রায়ারেড্ডিকে অবিলম্বে তার এই বিতর্কিত মন্তব্য সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিতে হবে এবং প্রকাশ্যে বৃহত্তর হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।

 

তিনি যদি এটি করতে ব্যর্থ হন, তবে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়াকে তাকে অবিলম্বে মন্ত্রিসভা থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করতে হবে। বিজেপির অন্যান্য প্রভাবশালী নেতারাও মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের সুপরিকল্পিত ‘ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি’ এবং সংখ্যালঘু তোষণনীতির একটি নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কড়া ভাষায় আখ্যায়িত করেছেন।

 

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাসবরাজ রায়ারেড্ডি পূর্বে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং প্রধান আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিসভার এক রদবদলে তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

 

ঠিক এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে তার এই ধর্মবিষয়ক মন্তব্য সামনে এলো, যখন দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগে আগে থেকেই কিছুটা ব্যাকফুটে থাকা কংগ্রেস সরকারকে লক্ষ্য করে বিজেপি ক্রমাগত তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

এমনিতেই কর্ণাটকের রাজনীতিতে ধর্ম এবং জাতপাতের সমীকরণ ঐতিহ্যগতভাবেই অত্যন্ত জটিল। তার ওপর নতুন করে তৈরি হওয়া এই ধর্মীয় বিতর্ক রাজ্যের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে যে আরও বেশি ঘোলাটে ও সংঘাতপূর্ণ করে তুলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

আগামী দিনগুলোতে এই বিতর্কের জল ঠিক কতদূর গড়ায় এবং কংগ্রেস সরকার কীভাবে এই রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে, সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক মহল এখন সেদিকেই গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাকিয়ে আছে।

 

- আরএনএস