রবিবার, নভেম্বর ১, ২০২৬
১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধর্ষণের শিকার নারী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

ভারতে থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধর্ষণের শিকার নারী
ছবি : Collected

নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার আশায় রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয়ে এক চরম ও মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হয়েছেন ভারতের এক নারী। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডের সেরাইকেলা-খারসাওয়ান জেলায় এক নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অভিযোগ জানাতে গিয়ে স্বয়ং থানা ভবনের ভেতরেই এক পুলিশ কনস্টেবলের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ওই নারী।

 

রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ভরসাস্থল নিয়ে চরম প্রশ্ন ওঠে। এই জঘন্য অপরাধের ঘটনায় ইতিমধ্যে অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

রোববার ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি তাদের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত উনত্রিশে অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতে ওই ভুক্তভোগী নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে চরম নিরুপায় অবস্থায় থানায় অভিযোগ দায়ের করার জন্য গিয়েছিলেন।

 

পারিবারিক কলহ এবং স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কায় তিনি সেদিন সন্ধ্যায় নিজের বসতবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। দিশেহারা অবস্থায় তিনি নিকটবর্তী এক প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে সাময়িক আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই নিজের মুঠোফোন ব্যবহার করে পুলিশের জরুরি সহায়তার জন্য যোগাযোগ করেন।

 

একজন অসহায় নাগরিকের ডাকে সাড়া দিয়ে পুলিশের একটি রাত্রিকালীন টহল দল সেই রাতেই তাকে ওই প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করে গামহারিয়া থানায় নিয়ে আসে। উদ্দেশ্য ছিল তাকে আইনি সুরক্ষা ও নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করা।

 

কিন্তু সেই আইনি সুরক্ষার আড়ালেই যে এমন এক ভয়াবহ ও অমানবিক পরিণতি লুকিয়ে ছিল, তা হয়তো তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি। থানায় পৌঁছানোর পর, কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা ওই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত নারীকে সাময়িক বিশ্রামের জন্য থানা ভবনের ভেতরেই একটি সুরক্ষিত কক্ষের ব্যবস্থা করে দেন।

 

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, যখন তিনি ওই নির্দিষ্ট কক্ষে একাকী বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই সুযোগেই থানায় ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে কর্মরত ওই অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবল তার ওপর পাশবিক কায়দায় হামলে পড়ে।

 

চরম অসহায় অবস্থায় থাকা ওই নারী থানার মতো একটি সরকারি ও সংরক্ষিত ভবনের ভেতরেই পাশবিক ধর্ষণের শিকার হন, যা গোটা পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তি ও দায়িত্ববোধের ওপর এক বিশাল কলঙ্কের দাগ লেপে দিয়েছে।

 

যে পুলিশের দায়িত্ব ছিল বিপন্ন মানুষের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেই পুলিশেরই এক সদস্যের এমন লালসার শিকার হওয়ার ঘটনাটি গোটা সমাজব্যবস্থার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের প্রশাসন কতটা নাজুক, এই ঘটনা যেন তারই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

 

এই ন্যক্কারজনক ও মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেরাইকেলা জেলার সিনিয়র পুলিশ সুপার (এসপি) মনোজ স্বর্গিয়ারী পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

 

তিনি পুরো ঘটনাটির একটি নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনার জন্য সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) অনুভব ভরদ্বাজকে কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এসডিপিও অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করেন এবং তার বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত প্রতিবেদনে ওই নারীর করা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হয়।

 

এই তদন্ত প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ কালক্ষেপণ না করে অভিযুক্ত ওই পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে আদালতে উপস্থাপন করা হলে বিচারক তাকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন।

 

একই সঙ্গে, এই জঘন্য অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে থানার অন্যান্য কর্মকর্তাদের চরম দায়িত্বহীনতা এবং কর্তব্যে অবহেলার বিষয়টিও সামনে উঠে আসে। এসপি মনোজ স্বর্গিয়ারী এই বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে গামহারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) মোট পাঁচজন পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।

 

পুলিশের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কর্তব্যে চরম অবহেলা, শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের দায়ে বরখাস্তকৃত এই পাঁচ পুলিশ সদস্যকে অবিলম্বে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। অপরাধের আলামত হিসেবে ঘটনার সময় অভিযুক্ত কনস্টেবলের পরিহিত পোশাক ও অন্যান্য জিনিসপত্র পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জব্দ করেছে।

 

জব্দকৃত এই গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য রাজ্যের রাজধানী রাঁচিতে অবস্থিত ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর যাবতীয় প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। ফরেনসিক বিজ্ঞানাগারের এই বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন বিচার প্রক্রিয়ায় একটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে, যাতে আইনি বিচারে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

 

এদিকে, রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত প্রতিষ্ঠানে এমন অমানবিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ঝাড়খণ্ড রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির জন্য ক্ষমতাসীন জোট সরকারকে সরাসরি দায়ী করেছে।

 

বিরোধী দলটির নেতাদের মতে, রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কোনো ধরনের জবাবদিহি বা শৃঙ্খলার ভয় না থাকার কারণেই ঝাড়খণ্ডে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।

 

ঝাড়খণ্ড রাজ্য বিজেপির সভাপতি ও ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সম্মানিত সংসদ সদস্য আদিত্য সাহু এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর ও বিস্ফোরক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

 

গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, রাজ্যের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোতে চরম দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে, যেখানে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ প্রদান করে পুলিশ কর্মকর্তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় নিজেদের পোস্টিং বা নিয়োগ নিশ্চিত করে থাকেন।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এই দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তারা মূলত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ ছত্রচ্ছায়ায় রাজ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন, লৌহ আকরিক পাচার এবং কয়লা চুরির মতো বিশাল বিশাল দুর্নীতির সুযোগ করে দিচ্ছেন।

 

সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তারা অপরাধীদের রক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। আর ঠিক এই কাঠামোগত অবক্ষয় ও দুর্নীতির কারণেই রাজ্যের বর্তমান শাসক জোট-যাতে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম), ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-তাদের ওপর থেকে রাজ্যের সাধারণ জনগণ পুরোপুরিভাবে আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

 

বিরোধী দলের এই অভিযোগ রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং আসন্ন দিনগুলোতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

 

পরিশেষে বলা যায়, থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে একজন বিচারপ্রার্থী ও অসহায় নারীর এমন পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাটি একটি সভ্য সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জাজনক।

 

এটি কেবল একজন বিপথগামী পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক বিশাল কাঠামোগত দুর্বলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ। সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে নারীদের জন্য যখন স্বয়ং পুলিশ স্টেশনই আর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হতে পারছে না, তখন সমাজের অন্যান্য স্তরের নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নারী নিরাপত্তা ও পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। এই জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ও নৈতিক সংস্কারের মাধ্যমেই কেবল সাধারণ মানুষের এই ভেঙে পড়া বিশ্বাস পুনরায় অর্জন করা সম্ভব। অন্যথায়, আইনের রক্ষকদের প্রতি সাধারণ মানুষের এই আস্থাহীনতা সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই এক অশনিসংকেত বয়ে আনবে।

 

- এনডিটিভি