বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড

দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আত্মগোপনে থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আত্মগোপনে থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও কলঙ্কজনক অধ্যায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের বিচার প্রক্রিয়ায় এবার একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

 

দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর দেশের বাইরে ও অভ্যন্তরে আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে ধরা পড়েছেন এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া অন্যতম অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফ্ফর হোসেন।

 

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ অত্যন্ত গোপনীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিযানের মাধ্যমে তাকে রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের সামরিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

 

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে গণমাধ্যমের কাছে এই হাই-প্রোফাইল গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

 

গোয়েন্দা বিভাগের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গোপন ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার দিবাগত রাতে রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী ডিওএইচএস-এ একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেই সফল অভিযানেই দীর্ঘকালের পলাতক এই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

 

বর্তমানে তাকে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে রিমান্ডে রেখে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের পেছনের অনেক অজানা তথ্য ও পলাতক জীবনের বিস্তারিত বিবরণ জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

 

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে একটি মর্মান্তিক ও রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। এদিন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী ও বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা অতর্কিত ও সশস্ত্র হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

 

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সেই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে যে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং সরাসরি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফ্ফর হোসেন এবং ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন।

 

বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, সামরিক আদালতের নথিপত্র এবং এই হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত একাধিক মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, মেজর মোজাফ্ফর হোসেনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও চূড়ান্ত। সেই কালরাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন নিজ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এই মেজর মোজাফ্ফর হোসেনই তাকে প্রথম শনাক্ত করেন।

 

কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে তিনিই প্রথম রাষ্ট্রপতির দিকে সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেন এবং গুলি চালান। রাষ্ট্রপতির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর পরই তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের চব্বিশ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করেন।

 

সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অত্যন্ত দাম্ভিকতার সঙ্গে তিনি বার্তা দেন যে, রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছেন। এই একটিমাত্র ফোন কলই প্রমাণ করে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে তার কতটা গভীর ও সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল।

 

রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে যে চরম অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তা দমনে সেনাবাহিনী দ্রুত পাল্টা অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের নিয়ন্ত্রণে এলে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

পরবর্তী সময়ে আটক অবস্থায় অত্যন্ত নাটকীয় ও রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মেজর জেনারেল মঞ্জুর নিহত হন। অন্যদিকে, বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

 

কিন্তু সেই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মেজর মোজাফ্ফর হোসেন এবং মেজর এস এম খালেদ নামের অপর এক অভিযুক্ত কর্মকর্তা অত্যন্ত সুকৌশলে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

 

তদন্তসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর মেজর মোজাফ্ফর হোসেন দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করছিলেন।

 

পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য তিনি একাধিক ছদ্মনাম ও ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করতেন। এসব ভুয়া পরিচয়ের আড়ালেই তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন এবং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন।

 

দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি এই পলাতক জীবনযাপন করে আসছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের এই পলাতক জীবনের অবসান ঘটেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এই অভাবনীয় সাফল্য দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি বড় বার্তা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত ও নির্মম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ও অন্ধকার অধ্যায়ে নতুন করে আলোকপাত করা সম্ভব হবে।

 

যেহেতু তিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং ঘটনাটি সামরিক বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তার বিরুদ্ধে পরবর্তী কঠোর আইনগত পদক্ষেপ ও বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে।