পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘রেইজ’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দেশব্যাপী একাধিক চাকরি মেলায় ছয় হাজার দুইশ বিরানব্বই জন দক্ষ তরুণ-তরুণীর তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।
অত্যন্ত আনন্দদায়ক বিষয় হলো, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এই তরুণদের মধ্যে দুই হাজার তেষট্টি জনই নারী। মূলত দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের পিছিয়ে পড়া, সুবিধাবঞ্চিত এবং মাঝপথে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া তরুণ জনগোষ্ঠীকে বাস্তবমুখী কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মূলধারার অর্থনীতিতে সরাসরি যুক্ত করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই এই কর্মসংস্থান মেলার আয়োজন করা হয়েছিল, যা বর্তমানে দেশের শ্রমবাজারে ব্যাপক ও ইতিবাচক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত তাত্ত্বিক শিক্ষার প্রথাগত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ বাজার-চাহিদাভিত্তিক এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষানবিশ মডেলে এই রেইজ প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে।
এই মডেলের অধীনে প্রশিক্ষণার্থীরা নিজ নিজ পেশায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ কারিগর বা ওস্তাদদের সরাসরি ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে হাতে-কলমে কাজ শেখার অভাবনীয় সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু পেশাগত কারিগরি দক্ষতাই নয়, কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য আচরণগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত আর্থিক ভাতাও প্রদান করা হচ্ছে।
এই আর্থিক সহায়তা বিশেষ করে নারী এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশের তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে একটি অত্যন্ত কার্যকরী ও বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। প্রকল্পটির সফলতার মাত্রা নির্ধারণে পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি জরিপ বা ট্রেসার স্টাডিতে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক চিত্র উঠে এসেছে।
ওই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, এই নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সফলভাবে সমাপ্ত করার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শতকরা অষ্টাশি ভাগ তরুণ-তরুণী সমাজে সম্মানজনক কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পেরেছেন।
এর মধ্যে শতকরা চৌষট্টি ভাগ প্রশিক্ষণার্থী বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে মজুরিভিত্তিক চাকরিতে প্রবেশ করেছেন এবং শতকরা চব্বিশ ভাগ প্রশিক্ষণার্থী নিজেদের অর্জিত দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে প্রকল্পটির অসামান্য কার্যকারিতারই সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। সংস্থাটির দায়িত্বশীল সূত্র আরও জানায়, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি মজবুত সেতুবন্ধন তৈরি করতে দেশের আঠাশটি জেলায় ইতোমধ্যে ছেচল্লিশটি চাকরি মেলা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।
এসব মেলায় দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যেমন-স্যামসাং, স্কয়ার, ওয়ালটন, প্রাণ-আরএফএল, ট্রান্সকম এবং সিঙ্গারসহ দেশের সাত শতাধিক স্বনামধন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে।
মেলায় অংশ নেওয়া মোট বারো হাজার পাঁচশ পঁচিশ জন চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি তরুণ-তরুণী মেলা প্রাঙ্গণেই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার বিরল সুযোগ লাভ করেন।
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে সমান সুযোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির এই অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেলটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত তরুণদের ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তনের যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা মোকাবিলার জন্য নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে একটি জাতীয় অনলাইন কর্মসংস্থান ব্যুরো বা আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলে তা শ্রমবাজারের সঠিক গতিপ্রকৃতি, শূন্যপদের তথ্য এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার পূর্বাভাস বুঝতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পিকেএসএফ দেশের শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশংসনীয় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
চলমান এই রেইজ প্রকল্পের অভাবনীয় ও দৃশ্যমান সাফল্য দেশের বৃহত্তর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং আগামীর উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।