মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচ দফা দাবিতে বুধবার থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম

পাঁচ দফা দাবিতে বুধবার থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি বড় ধরনের সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত পাঁচ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বুধবার থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি।

 

মঙ্গলবার দুপুরে সমিতির পক্ষ থেকে এই কঠোর কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ধর্মঘটের ফলে সারা দেশে জরুরি চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে এ ধরনের চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ধর্মঘটকে মানবাধিকার ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মঙ্গলবার গণমাধ্যমের কাছে এই ধর্মঘটের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাদবর।

 

পেশাদার এই সংগঠনের শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, আগামী বুধবার (২৯ জুলাই) সকাল ছয়টা থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের এই ধর্মঘট কর্মসূচি কার্যকর হবে। দীর্ঘদিন ধরে তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরে আসলেও কোনো কার্যকর সমাধান না মেলায় বাধ্য হয়েই তারা এই কঠোর সিদ্ধান্তের পথে হেঁটেছেন।

 

তাদের দাবিগুলো মূলত রোগী পরিবহনকারী যান পরিচালনা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ক্ষেত্রে যে কাঠামোগত বাধাগুলো রয়েছে, সেগুলো দূর করার সাথে সম্পর্কিত। যেহেতু মানুষের জীবনরক্ষায় এই জরুরি যানটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই এই খাতের সাথে জড়িতদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

 

মালিক সমিতির পক্ষ থেকে উত্থাপিত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট দাবির কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা মূলত তাদের পেশাগত সুরক্ষা ও সেবার মান উন্নয়নের সাথে জড়িত। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার দ্রুত বাস্তবায়ন।

 

মালিক সমিতির মতে, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে তাদের প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়, যা জরুরি সেবা প্রদানে বড় বাধা। তাদের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি হলো দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে জরুরি গাড়ি রাখার জন্য নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত স্থানের ব্যবস্থা করা।

 

বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে জরুরি মুহূর্তে গাড়ি রাখা নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা রোগীর উন্নত সেবাপ্রাপ্তিতে সরাসরি বিঘ্ন ঘটায়। এই সমস্যা সমাধানে হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত বিন্যাসে পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

মালিক সমিতির তৃতীয় এবং চতুর্থ দাবিটি মূলত সড়কে যান চলাচলের খরচের সাথে সম্পর্কিত। তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, রোগীর যান চলাচলের ক্ষেত্রে সড়ক কর বা টোল মওকুফ করার বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালতের একটি সুনির্দিষ্ট রায় রয়েছে।

 

সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চেয়ে তারা সারা দেশের সব সেতু ও মহাসড়কে জরুরি রোগীর যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সম্পূর্ণ টোলমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে, মৃতদেহ বহনকারী বিশেষায়িত যান বা হিমায়িত গাড়ি এবং লাশ বহনরত যেকোনো যানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের টোলমুক্ত সুবিধা প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে।

 

সাধারণত স্বজন হারানো পরিবারগুলো মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত থাকে, সেই মুহূর্তে যাতায়াতের বাড়তি খরচ তাদের জন্য আরও পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। তাই এই দাবিটিকে অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে মালিক সমিতি।

 

তাদের পঞ্চম ও শেষ দাবিটি হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা। অ্যাম্বুলেন্স যেহেতু একটি অতি জরুরি সেবা এবং যেকোনো মুহূর্তে এর প্রয়োজন হতে পারে, তাই দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা যেকোনো জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই যানের জন্য জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

অনেক সময় মধ্যরাতে বা ভোরবেলায় জ্বালানি সংকটের কারণে রোগীবহনে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটে, যা রোগীর জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই পাঁচটি দাবি পূরণের মাধ্যমে দেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পরিবহন খাতকে আরও সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব করা সম্ভব বলে মনে করছে সংগঠনটি।

 

যেকোনো দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় জরুরি রোগী পরিবহন সেবা একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রসূতি মা, মুমূর্ষু রোগী কিংবা গুরুতর দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই যানটির কোনো বিকল্প নেই। তাই দেশব্যাপী এমন একটি অপরিহার্য সেবার চাকা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে তা কার্যত পুরো স্বাস্থ্য খাতকেই অচল করে দিতে পারে।

 

বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যেসব রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা বড় শহরগুলোর বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়, তারা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও স্বাস্থ্য নীতিমালা অনুযায়ী, জরুরি চিকিৎসাসেবা কখনোই বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।

 

তাই সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার কথা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে, ধর্মঘট শুরু হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট মালিক সমিতির নেতাদের সাথে সরকারের দায়িত্বশীল মহলের জরুরি ভিত্তিতে একটি ফলপ্রসূ সংলাপে বসা একান্ত প্রয়োজন।

 

উভয় পক্ষের গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব, যা একই সাথে সেবাদাতাদের অধিকার নিশ্চিত করবে এবং সাধারণ রোগীদের জীবন বাঁচানোর পথকে মসৃণ রাখবে।

 

- আরএনএস