মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তীব্র গ্যাস সংকট মেটাতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী!

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

তীব্র গ্যাস সংকট মেটাতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী!
ছবি : File Photo

জাতীয় গ্রিডে নজিরবিহীন সরবরাহ ঘাটতি এবং একটি অন্যতম প্রধান ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় ও প্রশাসনিক সহযোগিতা চেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

সংকট নিরসনে মালয়েশিয়ার সুনির্দিষ্ট সহায়তা কামনা করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে বিশেষ কূটনৈতিক আবেদন পৌঁছানো হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপ এবং আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশের এই জরুরি আবেদনের বিষয়টি উত্থাপিত হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়ার সরকার প্রধান এই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশের পাশে থাকার জোরালো আশ্বাস প্রদান করেছেন।

 

মঙ্গলবার নিজ দপ্তরে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগের বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশে বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের ব্যাপ্তি ও জনভোগান্তি অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন।

 

উদ্ভূত পরিস্থিতির দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের লক্ষ্যে তিনি তাঁর বিশেষ উপদেষ্টা মাহদী আমিনের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে একটি লিখিত বিশেষ বার্তা প্রেরণ করেন।

 

পরবর্তীতে বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী মঙ্গলবার দুপুর ঠিক দুইটায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে এক অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় টেলিফোন সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

 

ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের বর্তমান শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ খাত এবং সাধারণ গৃহস্থালি জীবনে গ্যাসের অপ্রতুলতার কারণে সৃষ্টি হওয়া মারাত্মক দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার দ্রুততম হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা আহ্বান করেন।

 

এর জবাবে মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানানোর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

 

উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলসীমায় নোঙ্গর করে রাখা অন্যতম প্রধান ভাসমান এলএনজি মজুত ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট বা এফএসআরইউ (FSRU) আকস্মিকভাবে মারাত্মক কারিগরি ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে পড়ে।

 

এর ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে সারা দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ বাসাবাড়িতে এক নজিরবিহীন ও তীব্র গ্যাস সংকট বিরাজ করছে। জাতীয় জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা পেট্রোবাংলার আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল চাহিদা রয়েছে।

 

তবে এই কারিগরি দুর্ঘটনার দরুন জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে দৈনিক মাত্র ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে, যা সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কাছাকাছি। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের এই বিশাল ঘাটতির কারণে দেশের রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্প কারখানার উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে এবং সার্বিক জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

 

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় পর্যায়ের এই জরুরি পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সংশ্লিষ্ট বিভাগ সার্বক্ষণিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সংকট নিরসনে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) যৌথভাবে পরিস্থিতি তদারকি করছে।

 

বিশেষ করে ওই এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনা ও মেরামতের দায়িত্বে নিয়োজিত শীর্ষ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এক্সেলারেট এনার্জির সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের একটি প্রতিনিধি দল দুর্ঘটনাকবলিত পুনঃগ্যাসীকরণ কেন্দ্রটি অতি দ্রুত পুনর্নির্মাণ ও সচল করতে সমুদ্রবক্ষে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

প্রতিমন্ত্রী জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবেও এক্সেলারেট এনার্জির আন্তর্জাতিক সহ-সভাপতি আজিজ কাসিমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন এবং সর্বোচ্চ কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধানের জোরালো তাগিদ দিয়েছেন।

 

জরুরি ভিত্তিতে এফএসআরইউর সরাসরি কারিগরি সমাধানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং মিত্র দেশগুলো থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস দ্রুত আমদানির অল্টারনেটিভ বা বিকল্প সম্ভাবনাগুলো নিয়েও গুরুত্বের সাথে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার।

 

বিশেষ করে মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি দুই সরকারের মধ্যকার কূটনৈতিক সমঝোতা বা চুক্তির মাধ্যমে অতিরিক্ত এলএনজি দ্রুত আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

 

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই শীর্ষ নেতার এই প্রত্যক্ষ আলাপচারিতা এবং ফলপ্রসূ উদ্যোগের মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে দ্রুততম সময়ে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে। ফলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে প্রয়োজনীয় গ্যাসের পুনঃসংযোজন ঘটিয়ে পুরো দেশের শিল্প খাত ও জাতীয় জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।