মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির গাড়িবহরে অতর্কিত হামলা, সারজিসসহ আহত বহু!

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির গাড়িবহরে অতর্কিত হামলা, সারজিসসহ আহত বহু!
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলা সদরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি গাড়িবহরে অতর্কিত ও ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। দলটির পূর্বনির্ধারিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি সফলভাবে সমাপ্ত করে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।

 

দলীয় নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, স্থানীয় ছাত্রদলের একদল সশস্ত্র কর্মী পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। এই সহিংস হামলায় দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। পাশাপাশি দলটির ব্যবহৃত একাধিক যানবাহন ব্যাপকভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে।

 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ জনগণ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এক অশনিসংকেত।

 

প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ নামক একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যাবেলা দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা গাড়িবহর নিয়ে তাদের পরবর্তী নির্ধারিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মৌলভীবাজার জেলার দিকে রওনা হন।

 

ঠিক সেই মুহূর্তে হবিগঞ্জ সদর এলাকায় একদল দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গাড়িবহরের গতিরোধ করে এবং অতর্কিত আক্রমণ চালায়। হামলাকারীরা অত্যন্ত মারমুখী অবস্থানে ছিল এবং তারা কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই সরাসরি নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হয়।

 

এ সময় গাড়িবহরে থাকা নেতৃবৃন্দ আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও সশস্ত্র হামলাকারীদের তাণ্ডবে সেখানে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাস্তার আশেপাশে থাকা সাধারণ পথচারী ও ব্যবসায়ীদের মাঝেও এ সময় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

 

হামলাকারীরা প্রতিটি গাড়িতে নির্বিচারে ভাঙচুর চালায়, যার ফলে দলটির পরিবহন ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। একটি রাজনৈতিক দলের পূর্বঘোষিত ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিতে এমন বাধা প্রদান রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

এই নজিরবিহীন হামলার ঘটনার পরপরই রাত পৌনে আটটার দিকে হবিগঞ্জে অবস্থানরত জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তা পোস্ট করে ঘটনার ভয়াবহতা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।

 

তিনি তার বিবৃতিতে এই হামলার জন্য সরাসরি হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছেন। পাটওয়ারী তার পোস্টে বিস্তারিত উল্লেখ করে জানান, তারা যখন মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়ে ছাত্রদলের একদল সন্ত্রাসী হাতে হকিস্টিক, রামদা, লোহার চেইনসহ বিভিন্ন মারাত্মক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর এই পরিকল্পিত হামলা পরিচালনা করে।

 

হামলাকারীরা কেবল নেতাকর্মীদের ওপরই আঘাত করেনি, বরং তাদের সাথে থাকা মিডিয়া টিমের সদস্যদের ওপরও নির্বিচারে হামলা চালায় এবং সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাসহ মূল্যবান সরঞ্জামাদি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

 

এমনকি গাড়ির চালকদেরও তারা নির্মমভাবে প্রহার করে। পূর্বপরিকল্পিত এই আক্রমণের ধরন দেখে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শকে কণ্ঠরোধ করার হীন উদ্দেশ্যেই এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘটিত হয়েছে।

 

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার বিবৃতিতে আরও একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক দিকের প্রতি আলোকপাত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, যখন এই বর্বরোচিত হামলা চলছিল, তখন ঘটনাস্থলের খুব কাছাকাছি পুলিশ ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

 

কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই সদস্যরা হামলা প্রতিরোধের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। প্রশাসনের এমন নিষ্ক্রিয়তা হামলাকারীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। হামলায় দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের ওপর সরাসরি আঘাত হানা হয়।

 

এছাড়া হবিগঞ্জের স্থানীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। আক্রমণকারীদের নিষ্ঠুরতায় কারও হাত এবং কারও পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অনেক নেতাকর্মী গুরুতর জখম ও রক্তাক্ত অবস্থায় সড়কের ওপর লুটিয়ে পড়েছিলেন, যা একটি স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত কলঙ্কজনক।

 

এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এনসিপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার জন্য যারা অস্ত্র, সন্ত্রাস ও সহিংসতার মতো অন্ধকার পথ বেছে নেয়, তারা কখনোই সুস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করতে পারে না।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি জানান, এই জঘন্য হামলার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটি হামলাকারী, তাদের নেপথ্যের মদদদাতা এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অবিলম্বে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

 

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, প্রশাসন যদি দ্রুত এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

 

সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে অনতিবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।