মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হবিগঞ্জে এনসিপির ওপর বর্বরোচিত হামলা

সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত অবস্থানের ঘোষণা সারজিস আলমের

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম

সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত অবস্থানের ঘোষণা সারজিস আলমের
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির বা এনসিপি-এর নেতাকর্মীদের ওপর এক অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ছাত্রদল এবং যুবদলের সশস্ত্র নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

 

একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে এমন ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিচার না হওয়া পর্যন্ত হবিগঞ্জ শহরেই শক্ত অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই নির্মম হামলার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই এই জেলা ত্যাগ করবেন না; প্রয়োজনে তাদের প্রাণ যাবে, তবুও তারা এই চরম অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না।

 

মঙ্গলবার রাতে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে এক আবেগঘন ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই ভয়াবহ হামলার বিস্তারিত রোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন। সারজিস আলম অভিযোগ করেন, সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে এবং পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদল ও যুবদলের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা তাদের দলের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

 

এই পৈশাচিক হামলায় এনসিপির একাধিক নেতাকর্মী গুরুতরভাবে জখম হয়েছেন। তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে জানান, আক্রমণকারীদের নিষ্ঠুরতায় কারো হাত সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে, কারো মাথা ফেটে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয়েছে।

 

এমনকি এক কর্মীর চোখে লোহার রড দিয়ে এমনভাবে আঘাত করা হয়েছে যে, তার চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো এক আশঙ্কাজনক অবস্থা তৈরি হয়েছে। আরেকজন কর্মীর মুখেও রড দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়েছে।

 

শুধু শারীরিক নির্যাতনই নয়, হামলাকারীরা এ সময় এনসিপি নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, দামি ক্যামেরা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান সরঞ্জামও লুট করে নিয়ে যায় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

 

এই নজিরবিহীন হামলার নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা জি কে গউছের অনুসারীরা সরাসরি জড়িত বলে তিনি দাবি করেছেন। হামলার বীভৎসতা কেবল ঘটনাস্থলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; আহতদের জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথেও তাদের চরম বাধা ও পুনরায় বর্বরোচিত আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে বলে জানান সারজিস আলম।

 

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাত থেকে আটজন গুরুতর আহত ও মুমূর্ষু কর্মীকে নিয়ে যখন তারা জীবন বাঁচানোর তাগিদে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, ঠিক তখন হাসপাতালের প্রধান ফটকেই তাদের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়।

 

এই মর্মান্তিক ঘটনাকে তিনি গত জুলাই মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটে সংঘটিত বর্বরোচিত হামলার সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জি কে গউছের অনুগত ক্যাডার বাহিনী তাদের হাসপাতালে প্রবেশ করে চিকিৎসাসেবা নিতে দেয়নি এবং সেখানেও তাদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ও রড দিয়ে আঘাত করা হয়।

 

এই ভীতিকর পরিস্থিতিতে তিনি নিজেও রড ও লাঠিসোঁটার আঘাতের শিকার হয়েছেন বলে গণমাধ্যমকর্মীদের নিশ্চিত করেন। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম রহস্যজনক নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে গভীর ক্ষোভ ও চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন এনসিপির এই শীর্ষস্থানীয় সংগঠক।

 

তিনি অভিযোগ করেন, এত বড় একটি সহিংস ও প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটার সময় পুলিশ সেখানে উপস্থিত থাকলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি; বরং তারা কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।

 

পুলিশ আক্রান্তদের ন্যূনতম নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পুরো পরিস্থিতি কেবল পর্যবেক্ষণ করছিল বলে তিনি দাবি করেন। প্রশাসনের এই চরম নিষ্ক্রিয়তার কঠোর সমালোচনা করে তিনি জাতীয়তাবাদী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে এর সুস্পষ্ট জবাবদিহি দাবি করেছেন।

 

সারজিস আলম সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, নিছক রাজনৈতিক সমালোচনা এবং মতানৈক্যের কারণে যদি এভাবে বিরোধী মতের ওপর আক্রমণ করা হয়, তবে এর দায়ভার বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে নিতে হবে।

 

তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, তারা কি স্থানীয় পর্যায়ের এসব নেতাকে এ ধরনের সহিংস ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার কোনো ইজারা বা ঠিকাদারি দিয়ে রেখেছেন?

 

সবশেষে এক অটল ও আপসহীন অবস্থান ব্যক্ত করে সারজিস আলম ঘোষণা করেন, হবিগঞ্জের মাটিতে সংঘটিত এই বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কেউ পিছু হটবেন না।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, হামলাকারীরা চাইলে তাদের হত্যা করতে পারে এবং প্রয়োজনে এখান থেকে তাদের লাশ যাবে, তবে এই চরম অন্যায়ের উপযুক্ত আইনি ও রাজনৈতিক জবাব সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব এবং প্রশাসনকে অবশ্যই দিতে হবে।

 

একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহনশীলতার এমন চরম অভাব এবং ভিন্নমতের ওপর এমন সহিংস আক্রমণ দেশের সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা ও মানবাধিকারকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।