বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশু-কিশোরদের বহুমুখী মেধা বিকাশের মাধ্যমেই বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বাংলাদেশ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম

শিশু-কিশোরদের বহুমুখী মেধা বিকাশের মাধ্যমেই বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বাংলাদেশ
ছবি : Collected

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং সেই জাতির আগামী প্রজন্মের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সুষম বিকাশের ওপরও এটি সমানভাবে নির্ভরশীল।

 

দেশের শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভা, অদম্য সৃজনশীলতা এবং বহুমুখী মেধার সার্বিক বিকাশের মাধ্যমেই আগামী দিনের একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক বিশ্বের সাথে সমান্তরালে চলতে হলে ক্রীড়া, শিল্প-সংস্কৃতি এবং বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।

 

বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর বিকেলে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬-২৭’ (সিজন-২)-এর বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই যুগান্তকারী কথাগুলো ব্যক্ত করেন।

 

শিশু-কিশোরদের সার্বিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি একটি আধুনিক ও বিশ্বমানের জাতি গঠনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আগামীর আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের গুরুদায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের এই শিশু-কিশোরদের কাঁধেই ন্যাস্ত।

 

দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের উদ্দেশে তিনি এক গভীর অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা প্রদান করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই দেশটিকে তাদেরই নিজ হাতে নতুন করে গড়তে হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

 

শিশু-কিশোরদেরকে দেশের প্রকৃত মালিক ও বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের যোগ্য 'রাষ্ট্রদূত' বা অ্যাম্বাসেডর হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী প্রজন্মের মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমেই বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও গৌরবোজ্জ্বল হবে। আধুনিক পরিবর্তনশীল বিশ্বের অগণিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা যে যথেষ্ট নয়, সে বিষয়টি তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও যৌক্তিক ভাষায় বিশ্লেষণ করেন।

 

তাঁর মতে, শুধু চমৎকার প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল বা সনদভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে পুরো বিশ্ব জয় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় সমানভাবে পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে।

 

সমাজে প্রচলিত পেশাগত সফলতার ধারণার সাথে মানবিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের একটি চমৎকার সমন্বয় সাধনের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি উপস্থিত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে পড়াশোনা শেষ করে ভবিষ্যতে কেউ হয়তো স্বনামধন্য চিকিৎসক, দক্ষ প্রকৌশলী, সৃজনশীল স্থপতি কিংবা প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

কিন্তু পেশাগত এই অভাবনীয় সফলতার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে আবশ্যিকভাবে খেলাধুলা এবং শিল্প-সংস্কৃতির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকতে হবে। একজন মানুষ যখন একই সাথে তার পেশাগত বিদ্যায় পারদর্শী হয় এবং সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় গভীরভাবে অনুরাগী থাকে, তখনই তার মানবিক বিকাশ পূর্ণতা লাভ করে।

 

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) শিক্ষার্থীদের মনোজ্ঞ পরিবেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই শিক্ষার্থীরা কেবল মাঠের কঠোর পরিশ্রম ও খেলাধুলাতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং নাচ, গানসহ নানাবিধ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, ঐকান্তিক ইচ্ছা, শৃঙ্খলা ও চর্চা থাকলে একই সাথে সব ক্ষেত্রেই পারদর্শিতা অর্জন করা সম্ভব।

 

বিকেএসপির এই অদম্য তরুণদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে দেশের প্রতিটি শিশু-কিশোরকে তাদের বহুমুখী প্রতিভার উন্মেষ ঘটাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। "তোমরা পারো, ইউ ক্যান ডু ইট"-এমন দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হাজারো শিশু-কিশোরের মনে এক অভাবনীয় সাহস ও উদ্দীপনার সঞ্চার করেন।

 

তিনি তাদের এই বিশ্বাস ধারণ করতে শেখান যে, তারা চাইলে একই সাথে পড়ালেখায় দেশসেরা হতে পারে, খেলার মাঠে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে এবং সংস্কৃতির বিশাল মঞ্চেও নিজেদের আলো ছড়াতে পারে।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের সাথে জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান যে, 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস'-এর দ্বিতীয় আসরে ইতোমধ্যেই সারাদেশ থেকে ষোলো লাখের বেশি শিশু-কিশোর অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে।

 

অংশগ্রহণকারীদের এই বিশাল সংখ্যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলার আনাচে-কানাচে, প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিভার কোনো ঘাটতি নেই। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এই অগণিত ও অমূল্য প্রতিভাকে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে আনাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য।

 

আগামী বছরের জুন মাসে দেশব্যাপী চলা এই বিশাল প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি ঘোষণা দেন। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের পাঁচ শতাধিক উপজেলা, বিভিন্ন পৌরসভা ও জেলা পর্যায়ের অগণিত শিশু-কিশোর ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইনের মাধ্যমে এই বর্ণাঢ্য প্রতিযোগিতার সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছে, যা সরকারের ডিজিটাল কাঠামোর সফলতার একটি বড় প্রমাণ।

 

বর্তমান সরকার দেশের শিশু-কিশোরদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের ও প্রতিযোগিতামূলক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে যে বদ্ধপরিকর, তার একটি সুস্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী রূপরেখা প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণে ফুটে ওঠে।

 

তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই ষোলো লাখ প্রতিভাবান শিশুসহ দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। সরকার এমন একটি বাধাহীন ও চমৎকার পরিবেশ গড়ে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একটি শিশু কোনো ধরনের মানসিক বা সামাজিক চাপ ছাড়াই নিজের প্রথাগত পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অবাধে অংশগ্রহণ করতে পারবে।

 

পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সুযোগ-সুবিধাগুলো সম্প্রসারিত করা হবে। এর পাশাপাশি, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিশুদের আরও একধাপ এগিয়ে রাখার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী একটি যুগান্তকারী শিক্ষানীতির পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন।

 

তিনি জানান, দেশের প্রতিটি শিশুকে মাতৃভাষা বাংলা ও আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা শেখার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ প্রদান করা হবে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ছয় থেকে সাতটি বিদেশি ভাষার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দমতো যেকোনো একটি ভাষা বেছে নেওয়ার অনন্য সুযোগ পাবে।

 

পড়ালেখা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা এবং একাধিক বিদেশি ভাষায় দক্ষতার এই অভূতপূর্ব সমন্বয় যদি কোনো শিশুর মধ্যে ঘটানো যায়, তবে পৃথিবীর কোনো পরাশক্তিই আগামী দিনে বাংলাদেশের এই তরুণ প্রজন্মকে আর আটকে রাখতে পারবে না বলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী বক্তব্যের প্রতিটি লাইনে নিহিত ছিল আগামীর উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। তিনি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এমন একটি সোনালী দিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ স্বয়ং একটি শক্তিশালী, সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবে সমগ্র বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠবে।

 

সেদিন বাংলাদেশের মানুষকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে অন্য কোনো দেশের উদাহরণ টানতে হবে না, বরং গোটা বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে বাংলাদেশের উদাহরণ দেবে। এর আগে, বৃহস্পতিবার বিকেল পৌনে তিনটার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনা জেলা স্টেডিয়ামের মূল অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছালে সেখানে এক উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

 

বর্ণিল বেলুন ও শান্তির প্রতীক সাদা পায়রা উড়িয়ে তিনি বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস'-এর দ্বিতীয় আসরের এই মহাযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে একই সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমে দেশের ৫০৩টি উপজেলাতেও এই বিশাল প্রতিযোগিতার একযোগে উদ্বোধন করা হয়।

 

এই মহাসমারোহে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল।

 

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আগ্রহভরে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) শিক্ষার্থীদের নান্দনিক বিভিন্ন শৈল্পিক ও ক্রীড়া পরিবেশনা উপভোগ করেন। সর্বোপরি, বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র চীনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিবেশিত তাদের ঐতিহ্যবাহী 'ড্রাগন ড্যান্স' ও 'লায়ন ড্যান্স' এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মাত্রাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা স্টেডিয়ামে উপস্থিত অগণিত দর্শকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীও গভীরভাবে উপভোগ করেন। এই বিশাল আয়োজন বাংলাদেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।