একই সঙ্গে তিনি এক অভিনব ও দম্ভোক্তিপূর্ণ বার্তায় জানিয়েছেন, ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় দাফনানুষ্ঠান ও শেষকৃত্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন তেহরানকে এক সপ্তাহের জন্য সময় বা এক ধরনের অঘোষিত ছুটি দিয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এমনটি করেছে কারণ তারা ‘ভালো মানুষ’। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমনিতেই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য নতুন করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গত শুক্রবার, অর্থাৎ ৩ জুলাই রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত মাউন্ট রাশমোরে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব কথা বলেন। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বাধীনতার আড়াই শতক বা ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে এবং এই ঐতিহাসিক ক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই তিনি ওই দীর্ঘ ভাষণ প্রদান করেন।
নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দেওয়া ওই ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক সামরিক আধিপত্য, শ্রেষ্ঠত্ব এবং কমিউনিজমের মতো মতাদর্শগত হুমকির কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মার্কিন স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হলে তার জবাব দেওয়া হবে অত্যন্ত কঠোরভাবে।
ভাষণের এক পর্যায়ে লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে আনেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন যে, মার্কিন প্রশাসন অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে মাত্র একদিনের ব্যবধানে ভেনিজুয়েলার মতো রাষ্ট্রকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ ইরানকে সম্পূর্ণভাবে ধরাশায়ী করে ফেলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমন এক নাজুক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, তারা এখন যেকোনো মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত মীমাংসায় আসতে চায়। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, তেহরান এখন সমঝোতার জন্য আক্ষরিক অর্থেই মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
ইরানের বর্তমান জাতীয় শোক এবং আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানের দিকে ইঙ্গিত করে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বলেন, খামেনির মৃত্যুতে ইরানে যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সেটিকে সম্মান দেখাচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, আমরা ভালো মানুষ বলেই খামেনির শেষকৃত্য, ধর্মীয় আচার এবং রাষ্ট্রীয় দাফন অনুষ্ঠানের জন্য তেহরানকে পুরোপুরি এক সপ্তাহের সময় দিয়েছি। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকছে বলেও তিনি প্রচ্ছন্নভাবে ইঙ্গিত দেন।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন বক্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রশাসনের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার আস্ফালনই প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন দম্ভোক্তির মধ্যেই ইরানে চলছে তাদের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের বিশাল আয়োজন।
গত শুক্রবার তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিন প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে প্রকাশ্যে আনা হয়। অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও শোকাবহ এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, শীর্ষ কূটনীতিক এবং উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে এই প্রভাবশালী নেতার প্রতি তাদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সূচি অনুযায়ী, আজ শনিবার এবং আগামীকাল রোববার খামেনির কফিন রাজধানী তেহরানের সুবিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।
ইতিমধ্যেই প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখতে এবং চিরবিদায় জানাতে তেহরানের রাজপথে লাখো মানুষের বাঁধভাঙা ঢল নেমেছে। শোকাহত জনতার এই বিশাল সমাগম কেবল শোক প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মার্কিন এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদী রূপ ধারণ করেছে।
উপস্থিত অসংখ্য মানুষের হাতে দেখা গেছে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ‘লাল পতাকা’, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের আপসহীন অবস্থানের এক স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা ও লাখো জনতার শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মরদেহ একটি সুদীর্ঘ ধর্মীয় যাত্রার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
প্রথমে কফিনটি নেওয়া হবে ইরানের আরেক পবিত্র ও ধর্মীয় নগরী কোমে। সেখানে ধর্মীয় নেতাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সেটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকে স্থানান্তর করা হবে। ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহর হয়ে কফিনটি পৌঁছাবে ঐতিহাসিক কারবালায়, যা শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ইরাকের এই পর্ব শেষে মরদেহটি পুনরায় ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সবশেষে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র মাশহাদ শহরে নিয়ে গিয়ে সেখানকার বিখ্যাত ও পবিত্র ইমাম রেজার মাজারে তাঁর চূড়ান্ত দাফনকার্য সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান এই চরম অস্থিতিশীল ও উত্তেজনাকর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে একদিকে ইরানের এমন বিশাল পরিসরের রাষ্ট্রীয় শোক ও প্রতিশোধের স্পৃহা, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন তীক্ষ্ণ মন্তব্য-সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন ও জটিল সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক কূটনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।