সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৪ এএম

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা
ছবি : Collected

লাতিন আমেরিকার সর্ববৃহৎ দেশ ও বিশ্বের অন্যতম প্রধান উদীয়মান অর্থনীতি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্ব বা রানঅফের ভোট গণনা আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে। চরম নাটকীয়তা, উত্তেজনা ও শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে ডানপন্থি শিবিরের কট্টর প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে অত্যন্ত সামান্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ব্যবধানে পরাজিত করে টানা চতুর্থবারের মতো দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে আসীন হতে যাচ্ছেন বর্ষীয়ান বামপন্থি নেতা ও ঐতিহ্যগতভাবে কট্টর ফিলিস্তিনপন্থি হিসেবে বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে সাম্প্রতিক দশকের অন্যতম মেরুকৃত, বিভাজিত এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর কেবল ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, বরং সমগ্র লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।

 

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বাংলাদেশ সময় সোমবার ভোর সোয়া ৬টার দিকে দেওয়া এক ব্রেকিং নিউজে নিশ্চিত করেছে যে, ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট বা সর্বোচ্চ নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইতোমধ্যেই ৯৯ শতাংশ ব্যালট গণনার কাজ সুচারু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

 

প্রাপ্ত চূড়ান্ত ফলাফলের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন ও তুমুল জনপ্রিয় রাজনীতিক লুলা দ্য সিলভা ৫১ দশমিক ৭৫ শতাংশ জনসমর্থন নিশ্চিত করে তার চূড়ান্ত বিজয় সুনিশ্চিত করেছেন। অপরদিকে, চরম ডানপন্থি মতাদর্শের ধারক ও বিরোধী শিবিরের প্রধান প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট।

 

শতকরা হিসেবে দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের এই ব্যবধান এতটাই সামান্য যে, ভোট গণনার প্রতিটি মুহূর্ত ও প্রতিটি ধাপ উভয় শিবিরের নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ ভোটারদের জন্য চরম উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা ও স্নায়ুচাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

 

দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কারণে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাউকেই নিশ্চিত বিজয়ী হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনো সুযোগ বা অবকাশ ছিল না। ফলে সমগ্র জাতির নজর নিবদ্ধ ছিল নির্বাচন কমিশনের ইলেকট্রনিক প্যানেল ও ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে।

 

ব্রাজিলের সংবিধানে উল্লেখিত বর্তমান নির্বাচনী আইনের কঠোর বিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সরাসরি বিজয়ী হতে হলে প্রথম দফার ভোটাভুটিতে অবশ্যই মোট প্রদত্ত বৈধ ভোটের শতকরা ৫০ ভাগের বেশি অর্থাৎ অর্ধেকের চেয়ে অন্তত এক ভোট বেশি পেতে হয়।

 

গত ৪ অক্টোবর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ অত্যন্ত উৎসবমুখর কিন্তু টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও শীর্ষস্থানীয় কোনো একক প্রার্থীই প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোটের সেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে সক্ষম হননি।

 

ফলে নিয়মানুযায়ী সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া শীর্ষ দুই প্রার্থীকে নিয়ে রানঅফ বা দ্বিতীয় দফার চূড়ান্ত ভোটাভুটির আয়োজন করা হয়। প্রথম দফার সেই নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারো সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে চমক সৃষ্টি করেছিলেন এবং অন্যদিকে লুলা দ্য সিলভা দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন।

 

কিন্তু রানঅফের চূড়ান্ত লড়াইয়ে এসে হিসাব-নিকাশ ও সকল রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণভাবে উল্টে যায়। ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি তাদের এক গভীর বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ব্রাজিলের আধুনিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসে, বিশেষ করে ১৯৮৮ সালে নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন ও কার্যকর হওয়ার পর এবারই প্রথমবারের মতো এমন এক অভাবনীয় ও বিরল রাজনৈতিক ঘটনা ঘটল, যেখানে প্রথম দফার নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে শীর্ষস্থানে থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বা রানঅফ নির্বাচনে গিয়ে সেই প্রার্থী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হলেন।

 

ফ্লাভিও বলসোনারোর এই পরাজয় মূলত ব্রাজিলের রাজনীতিতে বলসোনারো পরিবারের দীর্ঘদিনের আধিপত্য, উগ্র ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান এবং তাদের রাজনৈতিক দর্শনের ওপর একটি বড় ও মোক্ষম আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ফ্লাভিও হলেন ব্রাজিলের সাবেক বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট জেয়ার বলসোনারোর সন্তান এবং তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি। জেয়ার বলসোনারো তার শাসনামলে নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, উগ্র ডানপন্থি নীতি এবং পরিবেশ ধ্বংসকারী পদক্ষেপের কারণে দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিলেন।

 

গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও এই বর্ষীয়ান নেতা লুলা দ্য সিলভার কাছে পরাজিত হয়েই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন জেয়ার বলসোনারো। তবে সেই গণতান্ত্রিক পরাজয় তিনি স্বাভাবিকভাবে ও সহজে মেনে নিতে পারেননি।

 

ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তিনি দীর্ঘ টালবাহানা করেন এবং তার প্ররোচনায় ও উসকানিতে সামরিক বাহিনীর একাংশ এবং তার কট্টর সমর্থকরা দেশে এক নজিরবিহীন অভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংসের অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

 

পরবর্তীতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নগ্ন আক্রমণ, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের দায়ে জেয়ার বলসোনারো বিভিন্ন আইনি ও বিচারিক জটিলতায় পড়েন। ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আদালত তাকে ভবিষ্যতে যেকোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করে।

 

পিতার সেই শূন্যস্থানে এবং আইনি নিষেধাজ্ঞার কারণে কট্টর ডানপন্থি শিবিরের হাল ধরেন তরুণ সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। কিন্তু পিতার মতো তিনিও শেষ পর্যন্ত লুলার বামপন্থি জনপ্রিয়তার বিশাল ঢেউয়ের কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন।

 

লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা ব্রাজিলের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয়, দূরদর্শী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। একসময়কার অতি সাধারণ এক শ্রমিক নেতা থেকে উঠে এসে তিনি বারবার দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন, যা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসেও এক বিরল দৃষ্টান্ত।

 

এটি তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এক অনন্য মাইলফলক, কেননা তিনি চতুর্থবারের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় এই দেশটির নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন। তার এই বিজয় শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী বার্তা বহন করে।

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে লুলা দ্য সিলভা ঐতিহ্যগতভাবে কট্টর ফিলিস্তিনপন্থি নেতা হিসেবে সুপরিচিত। মধ্যপ্রাচ্য সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি সবসময় আপসহীন ও সোচ্চার থেকেছেন।

 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম এবং জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে তার জোরালো অবস্থান একাধিকবার ব্যক্ত করেছেন। তার এই পুনর্নির্বাচন বিশ্বমঞ্চে বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করবে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

তবে চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণ করলেও লুলার সামনের পথ খুব একটা মসৃণ বা বাধাহীন হবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বর্তমান ব্রাজিলের সমাজ রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে গভীরভাবে দ্বিধাবিভক্ত ও মেরুকৃত।

 

ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রায় ৪৮ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পাওয়া এই ইঙ্গিতই সুস্পষ্টভাবে প্রদান করে যে, দেশে এখনো কট্টর ডানপন্থি আদর্শের একটি বিশাল ও সুসংগঠিত জনভিত্তি রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক বিরোধী মতের মানুষকে আস্থায় নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করা লুলার জন্য তার নতুন মেয়াদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে।

 

এর পাশাপাশি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় চাঙ্গা রাখা, আমাজন বনাঞ্চলের বেআইনি উজাড় বন্ধ করে তার পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পরিবেশগত নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন, চরম দারিদ্র্য বিমোচন এবং দেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মতো গুরুদায়িত্ব তার কাঁধে বর্তাবে।

 

তার পূর্ববর্তী মেয়াদগুলোতে তিনি যেভাবে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছিলেন এবং ব্রাজিলের অর্থনীতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, দেশের আপামর জনসাধারণ এবারও তার কাছে ঠিক অনুরূপ কল্যাণমুখী নেতৃত্বের প্রবল প্রত্যাশা করছে।

 

লুলার এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোর রাজপথে লাখ লাখ সমর্থক উল্লাসে মেতে ওঠে। অপরদিকে, পরাজয়ের পর ফ্লাভিও বলসোনারোর শিবিরে নেমে আসে হতাশা ও নীরবতা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকেও এই বিজয়ের পর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে।

 

আলজাজিরা, রয়টার্স এবং বিবিসির মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো লুলার এই বিজয়কে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে বামপন্থি প্রগতিশীল ধারার পুনরুত্থান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত জয় হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে।

 

সর্বোপরি, এই চরম উত্তেজনাকর ও শ্বাসরুদ্ধকর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এমন একজন পরীক্ষিত নেতাকে বেছে নিয়েছে, যার ওপর তারা দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান পুনরায় নিশ্চিত করার পূর্ণ ভরসা রেখেছে।

 

- বিবিসি, আলজাজিরা, রয়টার্স