শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউক্রেনের অবরুদ্ধ ওলেশকি শহরে মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম

ইউক্রেনের অবরুদ্ধ ওলেশকি শহরে মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা
ছবি : Collected

দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতা যখন গোটা বিশ্বকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে একটি অভাবনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্যের খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী এবং মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন প্রদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত ওলেশকি শহরে একটি স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন।

 

দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাতের কারণে ওই শহরটি কার্যত একটি অবরুদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছিল। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও রাষ্ট্রীয় দপ্তর ক্রেমলিনও এই মানবিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ফার্স্ট লেডির এই সরাসরি হস্তক্ষেপ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি অঞ্চলে আটকে পড়া অসহায় মানুষের জন্য নতুন করে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

 

ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে দিনিপ্রো নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ওলেশকি শহরটি ২০২২ সালে রুশ বাহিনী দখল করে নেওয়ার পর থেকেই এক অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের আগে এই শহরে প্রায় চব্বিশ হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও, মৃত্যু এবং ব্যাপক দেশত্যাগের কারণে বর্তমানে সেখানে মাত্র দুই হাজার মানুষের মতো অবশিষ্ট রয়েছেন।

 

বিগত কয়েক মাস ধরে রুশ এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ ও তীব্র লড়াইয়ের ঠিক মাঝখানে পড়ে সাধারণ বেসামরিক মানুষ চরমভাবে আটকে পড়েছেন। প্রতিনিয়ত গোলাবর্ষণ এবং যোগাযোগের সমস্ত পথ অবরুদ্ধ থাকার কারণে শহরটিতে খাদ্য, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, পানীয় জল এবং জ্বালানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী পৌঁছানো সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

 

চলতি মাসের শুরুর দিকে শহরটি থেকে কোনোক্রমে পালিয়ে আসা সাবেক বাসিন্দারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি-কে জানিয়েছিলেন যে, সেখানে তীব্র খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে, শহরটি বর্তমানে একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত সাধারণ মানুষের জন্য জীবন-মরণের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

 

এই চরম মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটেই গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ফার্স্ট লেডির দপ্তর থেকে মেলানিয়া ট্রাম্পের নিজস্ব স্বাক্ষরিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ওলেশকি শহরের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয় যে, সেখানকার অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং যুদ্ধের একেবারে সম্মুখসারিতে থাকা এই প্রাচীন শহরটি এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।

 

বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগামী উনত্রিশে অক্টোবর থেকে ওলেশকি শহরে এই বিশেষ যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হবে। তবে এটি একটি সম্পূর্ণ স্থানীয় যুদ্ধবিরতি, অর্থাৎ আপাতত এই সাময়িক অস্ত্রবিরতি শুধুমাত্র ওলেশকি শহর এবং এর আশেপাশের নির্দিষ্ট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যা ইউক্রেনের অন্যান্য রণাঙ্গনে প্রভাব ফেলবে না।

 

মেলানিয়া ট্রাম্প তার বিবৃতিতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, এটি এখন সবার কাছে সম্পূর্ণ স্পষ্ট যে তার সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অবরুদ্ধ শহরটিতে কোনোভাবেই মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা বয়স্ক ব্যক্তিদের নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া একেবারেই অসম্ভব হতো।

 

ফার্স্ট লেডির এই ঘোষণার পরপরই ইউক্রেন এবং রাশিয়ার পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই সেখানে ব্যাপক পরিসরে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হবে বলে নিশ্চিত করেছেন ইউক্রেনের প্রধান আলোচক ও সরকারের শীর্ষ মুখপাত্র ডেভিড আরাখামিয়া।

 

গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিশেষ বার্তায় তিনি জানিয়েছেন যে, মেলানিয়া ট্রাম্প এবং পোপ লিও-র প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে একটি দীর্ঘ, জটিল ও অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই কাঙ্ক্ষিত চুক্তিটি অর্জিত হয়েছে।

 

এই চুক্তির আওতায় একটি সুরক্ষিত ‘মানবিক করিডোর’ বা নিরাপদ চলাচলের পথ তৈরি করা হবে, যার মাধ্যমে আটকে পড়া সাধারণ বাসিন্দারা নির্বিঘ্নে শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারবেন এবং একইসঙ্গে ওই অঞ্চলে আটকে থাকা মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে।

 

অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় দপ্তর ক্রেমলিনের পক্ষ থেকেও শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সফল মধ্যস্থতায় একটি স্থানীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

 

ক্রেমলিনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী এখন যৌথভাবে এই মানবিক চুক্তি বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

ক্রেমলিনের অন্যতম শীর্ষ মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ওলেশকি শহর থেকে যেসব সাধারণ ও বেসামরিক নাগরিক স্বেচ্ছায় চলে যেতে ইচ্ছুক, তাদেরকে সেই সুযোগ নির্বিঘ্নে দেওয়া হবে।

 

তবে, যুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই বিশাল ও জটিল স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে অন্তত কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। পেসকভ এই বিরল চুক্তি অর্জনে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের গঠনমূলক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

 

তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপেও এই মানবিক সংকটের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল।

 

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেসকভ বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের এই আন্তরিক প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান, কারণ তিনি এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে মানবিক কার্যক্রম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর অবদান রেখেছেন।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে মেলানিয়া ট্রাম্পের এই ভূমিকা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগেই মেলানিয়া ট্রাম্প সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগের একটি অত্যন্ত গোপন মাধ্যম তৈরি করেছিলেন।

 

ফার্স্ট লেডির কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, স্লোভেনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই সাবেক ফ্যাশন মডেল এবং বর্তমান মার্কিন ফার্স্ট লেডি সেই গোপন যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে ইতোমধ্যে যুদ্ধের ডামাডোলে বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া চৌত্রিশজন নিরপরাধ ইউক্রেনীয় শিশুকে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছেন।

 

তার এই নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর মানবিক কূটনীতি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। সর্বশেষ এই ওলেশকি যুদ্ধবিরতির ঘোষণাটি এমন এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সন্ধিক্ষণে এল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের অবসানের জন্য তার নিজস্ব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে জোরদার করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃশ্যত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দিক থেকে কিছুটা সরে এসে কৌশলগত কারণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন, যা সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

 

‘ওলেশকি পরিকল্পনা’ বা ‘ওলেশকি প্ল্যান’ নামে পরিচিত এই মানবিক উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য মেলানিয়া ট্রাম্প নিজে সরাসরি রাশিয়া এবং ইউক্রেন-উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন।

 

তিনি জানিয়েছেন যে, উভয় দেশের বেসামরিক প্রশাসনিক নেতারা এখন একসঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন এবং প্রকৃত মানবিক প্রয়োজনগুলো সরেজমিনে মূল্যায়নের জন্য তারা যৌথভাবে ওই বিধ্বস্ত শহরটি পরিদর্শন করবেন।

 

গত শুক্রবার প্রকাশিত বিবৃতিতে মার্কিন ফার্স্ট লেডি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, যেসব বাসিন্দা শহর ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে ইচ্ছুক, তাদের সবাইকে প্রয়োজনীয় সমস্ত সহায়তা দেওয়া হবে এবং তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য উপযুক্ত পরিবহনের ব্যবস্থাও করা হবে।

 

মেলানিয়া তার ধারণার কথা ব্যক্ত করে বলেন, দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে ওই বাসিন্দাদের কেউ হয়তো রাশিয়ায় আশ্রয় নিতে চাইবেন, আবার কেউ হয়তো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ফিরে যেতে চাইবেন।

 

এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অধিকার ও ইচ্ছার যাতে সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটে, তা নিশ্চিত করার জন্য মেলানিয়া ট্রাম্প এক অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, অবরুদ্ধ বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে যেন সব পক্ষ যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে, তা নিশ্চিত করতে তিনি নিজে সশরীরে উপস্থিত থাকবেন।

 

একইসঙ্গে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ মার্কিন গণমাধ্যম সংস্থা এই পুরো স্থানান্তর প্রক্রিয়াজুড়ে রাশিয়ান এবং ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে অবস্থান করবে এবং পুরো মানবিক কার্যক্রমটি অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে নথিবদ্ধ করবে।

 

যদিও কোন নির্দিষ্ট নিরপেক্ষ মার্কিন গণমাধ্যম সংস্থা এই বিশাল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করবে, তার নাম সুরক্ষার স্বার্থে তিনি আপাতত প্রকাশ করেননি। সামগ্রিকভাবে, ওলেশকি শহরের এই যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক উদ্ধার অভিযান কেবল ওই অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবনই বাঁচাবে না, বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত নিরসনে একটি নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহল গভীরভাবে বিশ্বাস করে।

 

- এএফপি, ফার্স্টপোস্ট