রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে ধরপাকড় ও দমন-পীড়ন হিটলারের শাসনকেও হার মানিয়েছে: তৃণমূল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম

দিল্লিতে ধরপাকড় ও দমন-পীড়ন হিটলারের শাসনকেও হার মানিয়েছে: তৃণমূল
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের ঘটনায় ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।

 

দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশের এই নজিরবিহীন আগ্রাসী আচরণ জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের কুখ্যাত শাসনকালকেও যেন বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে।

 

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতের রাজধানীতে এমন ঘটনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই ঘটনায় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তাপ এখন চরম আকার ধারণ করেছে।

 

বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোর ওপর যেভাবে প্রশাসনিক যন্ত্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দিল্লির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন যে, ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন দিল্লি পুলিশ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার এক ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে।

 

তার দাবি অনুযায়ী, রাজধানী শহর থেকে ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আটক করা হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক আটকের ঘটনায় কেবল যে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বা সমর্থকরাই রয়েছেন, তা কিন্তু নয়।

 

বরং আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ধরপাকড়ের শিকার হয়েছেন এমন বহু সাধারণ মানুষ, যাদের সঙ্গে রাজনীতির দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি রাজপথে হেঁটে চলা সাধারণ পথচারী কিংবা দৈনন্দিন কাজে বের হওয়া খেটে খাওয়া মানুষেরাও পুলিশের এই নির্বিচার আটকের হাত থেকে রেহাই পাননি।

 

বিরোধী নেতাদের মতে, জনমনে ভীতি সঞ্চার করা এবং যেকোনো মূল্যে সরকারবিরোধী জমায়েত বা প্রতিবাদ কর্মসূচিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই ধরনের ঢালাও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে প্রশাসন, যা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রীতিনীতির সঙ্গে একেবারেই বেমানান।

 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে যে ভোট চুরির অভিযোগ উঠেছে, তার প্রতিবাদ জানাতেই তৃণমূল কংগ্রেসের এই আন্দোলনের সূত্রপাত। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার দলের আরও পাঁচজন সংসদ সদস্য দিল্লিতে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন।

 

তারা কোনো বিশৃঙ্খলা বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে একটি সাধারণ বাসস্ট্যান্ডে বসে তাদের এই প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার ও তাদের পুলিশ বাহিনী এতটুকু গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার প্রদর্শন করেনি।

 

অহিংস এবং সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এই জমায়েতটিকেও তারা জোরপূর্বক ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে এবং নেতাদের তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে চরমভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকারের এমন অসহিষ্ণু আচরণ পুরো দেশের রাজনৈতিক মহলকে হতবাক করেছে এবং সরকার বিরোধীদের প্রতি কতটা মারমুখী হতে পারে, তা আবারও প্রমাণ করেছে।

 

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেকোনো নির্বাচিত সরকারের প্রধান শক্তি হলো দেশের সাধারণ জনগণ। কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড সেই মৌলিক ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে দাবি করেছেন তৃণমূলের এই যুব নেতা।

 

তিনি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, একটি রাজনৈতিক দল যদি প্রকৃত অর্থেই দেশের আপামর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে থাকে, তবে সেই সরকার সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে এত বেশি ভয় পাচ্ছে কেন?

 

জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য নির্বাচিত একটি সরকার কেন জনগণেরই কণ্ঠরোধ করার জন্য এতটা মরিয়া হয়ে উঠবে? তার মতে, এই ধরনের মাত্রাতিরিক্ত ভীতি ও দমনমূলক নীতি কেবল তখনই দেখা যায়, যখন কোনো সরকার তাদের জনসমর্থন হারানোর আশঙ্কায় ভোগে এবং নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

 

গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত পোষণ করা এবং সরকারের ভুলত্রুটির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানানো যেকোনো নাগরিকের জন্মগত অধিকার। কিন্তু বর্তমান শাসনব্যবস্থায় সেই অধিকারকে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত।

 

শুধু ধরপাকড় বা সমাবেশ পণ্ড করেই ক্ষান্ত হয়নি প্রশাসন, সাধারণ মানুষের চলাচলের স্বাধীনতাকেও চরমভাবে বিঘ্নিত করা হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেন যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন, ব্যস্ত রেলস্টেশন এবং এমনকি বিমানবন্দর পর্যন্ত অঘোষিতভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে।

 

ইতিহাসে সাধারণত দেখা যায় যে, কোনো দাবি আদায়ে আন্দোলনকারীরা বা বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তাঘাট, ট্রেন বা মহাসড়ক অবরোধ করে থাকে। কিন্তু বর্তমান ভারতের চিত্রটি যেন সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে সরকার নিজেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রশাসনিক কাঠামোগুলোকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

 

বিক্ষোভকারীরা যেন কোনোভাবেই নির্দিষ্ট জমায়েতস্থলে পৌঁছাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে সরকার নিজেই সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে কার্যত অচল করে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে নিছক পেশিশক্তি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ বেছে নিয়েছে।

 

টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির এই চলমান পরিস্থিতি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন এবং অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের অনুগত প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে একটি অঘোষিত জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

 

হিটলারের শাসনামলের সঙ্গে এই পরিস্থিতির তুলনা টেনে তৃণমূল কংগ্রেস মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দেশের বুদ্ধিজীবী মহলকে একটি কড়া বার্তা দিতে চেয়েছে যে, ভারতের মতো একটি বহুত্ববাদী এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একনায়কতন্ত্রের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

 

বিরোধী দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার যদি এভাবেই প্রতিনিয়ত ভূলুণ্ঠিত হতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে দিল্লির এই পুলিশি ধরপাকড়, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নগ্ন হস্তক্ষেপের ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আগামী দিনের রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

- টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া