বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের নেতৃত্বেই মোদিবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল গতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

তরুণদের নেতৃত্বেই মোদিবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল গতি
ছবি : Collected

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, শিক্ষার্থীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং সর্বোপরি নির্বাচনব্যবস্থায় নজিরবিহীন অনিয়মের গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলন বর্তমানে এক নতুন ও চূড়ান্ত মাত্রা লাভ করেছে।

 

এই মুহূর্তে আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান ও অটল দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিঃশর্ত পদত্যাগ। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনা একসঙ্গে মোদি সরকারের জন্য এক বিশাল ও জটিল রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে, যা সামাল দিতে প্রশাসনকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

 

শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের এই তীব্র ক্ষোভের সূত্রপাত মূলত চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার জন্য অনুষ্ঠিত ভর্তি পরীক্ষায় ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। এই পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পর পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা দেশজুড়ে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক তীব্র অসন্তোষ ও হতাশার জন্ম দেয়।

 

নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগা শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে প্রতিবাদ শুরু করেন। এই চরম হতাশা ও বিচারহীনতার জেরে বেশ কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার মতো অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও বেশি সংবেদনশীল ও জটিল করে তোলে।

 

শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে বেকার তরুণদের নিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি অনভিপ্রেত মন্তব্য, যা তরুণ সমাজকে আরও বেশি সংগঠিত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

 

এই সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রের ক্ষোভের সঙ্গে যখন নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগ যুক্ত হয়, তখন এই আন্দোলন এক প্রবল রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে গুরুতর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠার বিষয়টি চলমান এই আন্দোলনে এক নতুন ও অপ্রতিরোধ্য গতি এনে দিয়েছে।

 

বিস্ময়করভাবে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের অপর দুই জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দেশের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় তেরো কোটি বৈধ ভোটারের নাম সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বাদ দেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুতর ও নজিরবিহীন অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার এই পরিকল্পিত পদক্ষেপ ভারতের সাম্প্রতিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, বিশেষ করে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অনুকূলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

 

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে এই প্রশ্ন ওঠার পেছনে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু আইনি পদক্ষেপও অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি প্রদানের বিষয়টি সর্বমহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছে।

 

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এসব আইনি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের একচ্ছত্র প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত।

 

এদিকে, রাজধানী নয়াদিল্লিতে এই তীব্র গণআন্দোলন নিয়ন্ত্রণের নামে সরকার নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পুরো রাজধানীকে কার্যত এক নিশ্ছিদ্র দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। আন্দোলন দমাতে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিল্লিতে হাজার হাজার আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

 

এমনকি দেশের স্পর্শকাতর অঞ্চল যেমন জম্মু ও কাশ্মীরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্যদের রাজধানীতে আনা হয়েছে। পাকিস্তান সীমান্তে জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকারী কিছু বিশেষায়িত বাহিনীকেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন দমনে মোতায়েন করার ঘটনা সরকারের চরম উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

 

চলমান এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী তরুণদের একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে নিজেদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামক এক অভিনব পরিচয়ে সংগঠিত করছে। এই আন্দোলনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এতে প্রধানত হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত তরুণেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন।

 

ফলশ্রুতিতে, সরকার চাইলেই খুব সহজে এই আন্দোলনকারীদের ওপর চরম কঠোর বলপ্রয়োগ বা দমননীতি চালাতে পারছে না, যা প্রশাসনের জন্য এক গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত জটিলতা তৈরি করেছে।

 

এর আগে ২০২০ সালে নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ-বিরোধী শাহিনবাগ আন্দোলন দমনে সরকার অত্যন্ত কঠোর বলপ্রয়োগ করেছিল এবং পরবর্তীতে কোভিড-১৯ মহামারির সুযোগ নিয়ে সেই আন্দোলন পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

 

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে হিন্দু মধ্যবিত্ত তরুণদের ওপর একই দমননীতির পুনরাবৃত্তি সরকারের জন্য নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই বিশাল গণআন্দোলন ভারতের বিরোধী দলগুলোর জন্যও এক অপ্রত্যাশিত ও সুবর্ণ রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।

 

চলমান এই সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রতি বিভিন্ন বিরোধী দলের প্রকাশ্য সমর্থন ও সংহতি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে, এই বিশাল জনসমর্থনকে নিজেদের পক্ষে টানতে ভারতের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেস এবং আম আদমি পার্টির মধ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে এক ধরনের অলিখিত রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

 

বিশেষ করে, আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে যে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচার শুরু হয়েছিল, চলমান এই তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে তার একটি গভীর ও আদর্শগত যোগসূত্র রয়েছে।

 

তরুণদের এই আন্দোলনের দাবিসমূহ কেবল নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ ব্যক্তির পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও যুগান্তকারী দাবি জাতির সামনে তুলে ধরেছেন।

 

তাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা থেকে যেসব বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে চিহ্নিত করা এবং তাদের কঠোর আইনি ও জবাবদিহির আওতায় আনা।

 

একইসঙ্গে, নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় মন্ত্রিসভায় ন্যূনতম পঞ্চাশ শতাংশ পদ সংরক্ষণ এবং জাতীয় সংসদে নারীদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

আন্দোলনকারী তরুণ সমাজ দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের সুস্পষ্ট দাবি, ক্ষমতাসীন সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত ও দলীয় প্রচারণায় লিপ্ত পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং দেশে একটি সত্যিকারের স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভীক সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

 

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় তারা আরও দাবি করেছেন যে, যেসব নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিধায়ক অনৈতিকভাবে দলবদল করে জনগণের রায়ের অবমাননা করেন, তাদের দীর্ঘ সময়ের জন্য যেকোনো ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় বা সরকারি পদে অধিষ্ঠিত থাকার সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে।

 

পাশাপাশি, রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের উৎস এবং নির্বাচনী অর্থায়নে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও এই আন্দোলনে জোরালোভাবে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে, তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র গণআন্দোলন ভারতের ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোট-উভয় পক্ষের জন্যই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে।

 

দেশের তরুণ সমাজ আজ রাজপথে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী স্বচ্ছতা, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মতো অত্যন্ত মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ইস্যুগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছেন।

 

তবে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিরোধী দলগুলো যদি তাদের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত থাকে এবং ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তবে এই সম্ভাবনাময় আন্দোলনের রাজনৈতিক সফলতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

 

ভারতের দীর্ঘদিনের লালিত গণতন্ত্র ও স্বচ্ছ নির্বাচনী ব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার এই বৃহত্তর স্বার্থে বিরোধী দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ কাটিয়ে উঠে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

- ডন