বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড ঘেরাও করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড ঘেরাও করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা
ছবি : Collected

শিক্ষামন্ত্রীর অনতিবিলম্বে পদত্যাগসহ সুনির্দিষ্ট তিন দফা দাবিতে রাজধানী ঢাকায় ফের রাজপথে নেমে এসেছেন উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি স্তরের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ঢাকা মহানগরীর অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সায়েন্সল্যাব মোড়ে দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক অবরোধ করে রাখার পর, দুপুরের দিকে বিক্ষুব্ধ এই শিক্ষার্থীরা ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড প্রাঙ্গণ ঘেরাও করেন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে শিক্ষার্থীদের মাঝে যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে, মঙ্গলবারের এই বিক্ষোভ ও ঘেরাও কর্মসূচি তারই একটি দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

 

দেশের অন্যতম প্রধান একটি প্রশাসনিক শিক্ষাবোর্ডের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই নজিরবিহীন অবস্থান কর্মসূচিকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য, উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের নিজেদের অধিকার আদায়ের এই সংগ্রাম নতুন না হলেও, প্রশাসনিক ভাষা ও মন্তব্যের কারণে সৃষ্ট এই ক্ষোভকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

 

ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার পরপরই রাজধানীর বকশীবাজার এলাকায় অবস্থিত ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দলে দলে জড়ো হতে শুরু করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

 

সেখানে অবস্থান নিয়ে তারা শিক্ষামন্ত্রীর দ্রুত পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদী স্লোগান দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের এই আকস্মিক ঘেরাও কর্মসূচির মুখে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

 

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য শিক্ষাবোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দলকে ভবনের ভেতরে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের এই প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাদের মূল দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।

 

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটি অবমাননাকর মন্তব্যকে সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে। ঢাকা আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী মারুফ হাসান সংবাদমাধ্যমের কাছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নিজেদের ক্ষোভ, বেদনা ও হতাশার কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দেশের সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে 'ফার্মের মুরগি' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা কোনো আত্মমর্যাদাশীল মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

এই শিক্ষার্থী আরও জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে এই সাধারণ শিক্ষার্থীরাই অকাতরে রাজপথে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন এবং সেই চরম ত্যাগের বিনিময়েই বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আজকের এই মর্যাদাপূর্ণ চেয়ারে বসতে পেরেছেন।

 

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বর্তমান একমাত্র এবং প্রধান দাবি হলো শিক্ষামন্ত্রীর দ্রুত পদত্যাগ। তার স্থানে এমন একজন শিক্ষাবান্ধব, সংবেদনশীল ও মার্জিত রুচির ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে, যিনি শিক্ষার্থীদের আবেগ, মেধা ও মর্যাদাকে যথাযথভাবে সম্মান করতে জানবেন।

 

এর আগে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এই শিক্ষার্থীরা প্রথমে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে বিশাল জমায়েত করে সর্বাত্মক সড়ক অবরোধ কর্মসূচির সূচনা করেন। ধানমন্ডি থেকে নিউমার্কেট অভিমুখী মূল সড়কটি অবরোধ করে রাখায় ওই এলাকার সামগ্রিক যান চলাচল ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।

 

রাজধানীর অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ত এই সড়কের দুই দিকেই সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। এর ফলে সাধারণ যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অসংখ্য যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে থাকে।

 

প্রখর রোদের মধ্যে কর্মজীবী সাধারণ মানুষ, নারী, বয়স্ক নাগরিক ও শিশুরা এই আকস্মিক সড়ক অবরোধের কারণে চরম ভোগান্তি ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। অনেকেই বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

 

শিক্ষাবোর্ডের সামনে শিক্ষার্থীদের এই ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা সংঘাত এড়াতে পুলিশ অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

 

ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের চকবাজার জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মাহফুজুর রহমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।

 

তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে জানান, শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ যে মূল দাবিগুলো নিয়ে আন্দোলন করছেন, তার সঙ্গে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের সরাসরি কোনো প্রশাসনিক বা নীতিগত সম্পর্ক নেই। পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের এই বিষয়টি অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করা হয়েছে।

 

তবে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবস্থানে অত্যন্ত কঠোর ও অনড় রয়েছেন এবং কর্তৃপক্ষের কোনো সান্ত্বনাবাক্যই শুনতে রাজি হচ্ছেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলপ্রয়োগ না করে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। উদ্ভূত এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে তা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।