সবশেষ প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ জন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই নতুন প্রাণহানির মধ্য দিয়ে চলতি বছরে হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে মৃতের মোট সংখ্যা ১ হাজার ৩০ জনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে ওঠা এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে চিকিৎসাকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে গেলেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষ এবং স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কপালের ভাঁজ আরও দীর্ঘ করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মানদণ্ডে বিচার করলে, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের এমন ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া নিঃসন্দেহে একটি বড় স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আয়োজিত নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেশের এই সর্বশেষ মহামারি পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। সরকারি এই পরিসংখ্যানে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে জানানো হয়েছে যে, রোববার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই হামের উপসর্গ নিয়ে ৪ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১০০ জন মানুষ। অন্যদিকে, হামের সুস্পষ্ট উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও হয়তো পরীক্ষার অভাবে বা অন্য কোনো কারণে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, এমন রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৩০ জনে।
সব মিলিয়ে মৃত্যুর এই বিশাল সংখ্যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মোকাবেলা করার জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। মৃত্যুর পাশাপাশি দেশজুড়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন রোগী। বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর এই বিপুল চাপ সামলাতে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ জ্বর, সর্দি, কাশি এবং গায়ে লালচে দাগ নিয়ে চিকিৎসার খোঁজে হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই বেশ গুরুতর, যাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যাতে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। আক্রান্ত রোগীদের বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিভাগ।
গত এক দিনে শুধুমাত্র ঢাকা বিভাগেই সর্বোচ্চ ৫২৪ জন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। আক্রান্তের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে নতুন করে ২৭৮ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হয়েছেন।
এছাড়া অন্যান্য বিভাগের মধ্যে সিলেট বিভাগে ১৫০ জন, বরিশাল বিভাগে ১৩১ জন, খুলনা বিভাগে ৮৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫৭ জন, রংপুর বিভাগে ২৬ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ২৩ জন রোগী নতুন করে ভর্তি হয়েছেন।
রাজধানী ও বন্দরনগরীর মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চ্যালেঞ্জ থাকায় সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশে এই প্রাদুর্ভাবের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংরক্ষিত তথ্য ভাণ্ডার থেকে জানা যায়, ওই দিন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৫২ হাজার ১১৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
তবে এই হতাশার মধ্যেও কিছু আশার আলো রয়েছে। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাওয়ার কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে নিজ গৃহে ফিরে গেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, এ পর্যন্ত চিকিৎসা গ্রহণ করে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন।
সুস্থতার এই হার চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ালেও, নতুন করে প্রতিদিন হাজারো রোগীর হাসপাতালে আগমন পরিস্থিতিকে আবারও ঘোলাটে করে তুলছে। গত কয়েক মাসের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে যে, ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৭২০ জনে।
এই বিপুল সংখ্যক সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ১২৪ জনের শরীরে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উপসর্গ থাকা সকল রোগীর সঠিক সময়ে পরীক্ষা করানো সম্ভব হলে নিশ্চিত আক্রান্তের এই সংখ্যা হয়তো আরও বেশি হতো।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সঠিক সময়ে হাসপাতালে আসা, আইসোলেশন মেনে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করার মাধ্যমে এই রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। দেশের প্রতিটি প্রান্তে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।