তবে আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিরক্তিকর সময়টিকে নেতিবাচকভাবে না দেখে, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনের একটি চমৎকার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব।
সঠিক অভ্যাস ও পরিকল্পিত জীবনযাপনের মাধ্যমে লোডশেডিংয়ের এই অন্ধকার সময়টিও হয়ে উঠতে পারে মানসিক প্রফুল্লতা বৃদ্ধি এবং শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার অন্যতম একটি প্রধান মাধ্যম।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় বিদ্যুৎবিহীন এই সময়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক হেলথ এসেনসিয়ালসের একটি সাম্প্রতিক গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল স্ক্রিন বা প্রযুক্তির বাইরে কাটানো এই সময়টিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'ডাউনটাইম' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
মানুষ যখন প্রযুক্তিপণ্য থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকে, তখন মস্তিষ্কের 'ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক' বা ডিএমএন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। মস্তিষ্কের এই বিশেষ প্রক্রিয়াটি মানুষের হারানো সৃজনশীলতা ফিরিয়ে আনতে, স্মৃতিশক্তিকে আরও প্রখর করতে এবং যেকোনো জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধিতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে, গবেষণাভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম 'রিসার্চগেট'-এ প্রকাশিত এক বিস্তারিত সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আকস্মিক উদ্বেগ ও অস্বস্তি তৈরি হয়, তা নিরসনে বই পড়া বা বুদ্ধিবৃত্তিক ধাঁধা সমাধানের মতো অফলাইন কাজগুলো মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও এই সময়টির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের চিকিৎসা বিষয়ক তথ্যমতে, যেকোনো ধরনের শারীরিক কসরত মানুষের মানসিক চাপ ও ভেতরের অস্থিরতা কমাতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।
লোডশেডিংয়ের সময় ঘরের বদ্ধ ও গুমোট পরিবেশ থেকে বেরিয়ে বারান্দা, ছাদ বা খোলা মাঠে মুক্ত বাতাসে পনেরো থেকে বিশ মিনিট হালকা ব্যায়াম, স্ট্রেচিং কিংবা যোগব্যায়াম করলে মানবদেহে 'এন্ডোরফিন' নামক বিশেষ হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়।
এই হরমোনটি তীব্র গরম ও চারপাশের অন্ধকারজনিত কারণে সৃষ্ট মানসিক অবসাদ ও শারীরিক ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে শরীরকে সতেজ ও প্রাণবন্ত করে তোলে। অধিকন্তু, বিদ্যুৎবিহীন এই সময়টিকে আধুনিক যুগে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি 'ডিজিটাল ডিটক্স' বা প্রযুক্তি থেকে সাময়িক বিরতি হিসেবে অনায়াসেই গ্রহণ করা যেতে পারে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে গভীরভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, দীর্ঘ সময় ধরে ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষের স্বাভাবিক মনোযোগের পরিধি মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
তাই বিদ্যুৎ না থাকার সময়ে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপের মতো যন্ত্রগুলো দূরে সরিয়ে রেখে ডায়েরি লেখা, প্রিয় কোনো গল্পের বই পড়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে লুডু, দাবা ও ক্যারামের মতো ঐতিহ্যবাহী ইনডোর গেমসে মেতে ওঠা যেতে পারে।
এটি যেমন চোখের ক্লান্তি দূর করে, তেমনি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সামাজিক গবেষণার তথ্যমতে, এ ধরনের সামনাসামনি আড্ডা ও সময় কাটানো মানুষের একাকীত্ব দূর করে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে তোলে।
প্রতিকূল পরিবেশে মনকে শান্ত ও প্রফুল্ল রাখতে সঙ্গীতের ভূমিকাও অপরিসীম বলে উল্লেখ করেছে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন। তাদের মতে, লোডশেডিংয়ের সময় প্রিয় কোনো শান্ত সুর বা গান শোনা স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করে এবং হৃদস্পন্দনের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখতে সহায়তা করে।
এর ফলে মস্তিষ্কে 'ডোপামিন' হরমোন নিঃসৃত হয়, যা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশেও মানুষকে মানসিকভাবে স্থির রাখে। তবে এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি বিদ্যুৎবিহীন সময়ে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কেও সতর্ক করেছে ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ।
সংস্থাটির পরামর্শ অনুযায়ী, লোডশেডিং চলাকালীন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেফ্রিজারেটরের দরজা বারবার খোলা থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ দরজা বন্ধ থাকলে ভেতরের খাবার অন্তত চার ঘণ্টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।
এছাড়া বদ্ধ ঘরে বিষাক্ত গ্যাস জমে শ্বাসকষ্ট বা মৃত্যুঝুঁকি এড়াতে কখনোই জেনারেটর বা কয়লা জাতীয় কোনো জ্বালানি ঘরের ভেতরে ব্যবহার করা উচিত নয়। একইসঙ্গে, অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মোমবাতির পরিবর্তে রিচার্জেবল লাইট বা বিকল্প নিরাপদ আলোর উৎস ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।