সোমবার, ২২ জুন স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে তিনি তাঁর এই নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের দিকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর। সঙ্গত কারণেই, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সফরটি একটি নতুন মাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে অত্যন্ত সফল ও প্রাণবন্ত কূটনৈতিক আলোচনার পর তাঁর এই চীন সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও ইতিবাচক বিশ্লেষণ চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে এই যাত্রার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, মালয়েশিয়ার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করার পর প্রধানমন্ত্রী চীনের দালিয়ানে দুই দিনের এক অত্যন্ত কর্মব্যস্ত সময় অতিবাহিত করবেন।
মূলত, দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম’-এর বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করাই তাঁর এই সফরের প্রথম ধাপের প্রাথমিক উদ্দেশ্য।
আন্তর্জাতিক এই বৃহৎ মঞ্চে বিশ্ব অর্থনীতি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রপ্রধান, নীতিনির্ধারক ও খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে তিনি নিবিড় মতবিনিময় করবেন।
এই ফোরামটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত, যেখানে বাংলাদেশের মতো একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশের বলিষ্ঠ উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গভীর তাৎপর্য বহন করে।
দালিয়ানের আনুষ্ঠানিকতা ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, বেইজিংয়ে তাঁর এই রাষ্ট্রীয় সফরের মূল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
সেখানে চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তাঁর একাধিক আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নানাবিধ কৌশলগত ক্ষেত্র নিয়ে বিশদ ও চূড়ান্ত আলোচনা হবে।
এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্রীয় সফর একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে, মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বুঙ্গা রায় প্রাঙ্গণের বিশেষ সুরক্ষিত অংশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে এক অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে সে দেশের ধর্মমন্ত্রী জুলফিকলি হাসান এবং তাঁর সহধর্মিণী বিমানবন্দরে সশরীরে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ ও আন্তরিক বিদায় জানান। দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বের চমৎকার নিদর্শনস্বরূপ এই বিদায়বেলাটি ছিল অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ এবং সম্মানজনক।
এ সময় বিমানবন্দরে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম এবং ডেপুটি হাইকমিশনার শাহানারা মনিকা সহ বাংলাদেশ দূতাবাসের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত রবিবার দুই দিনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার মাটিতে পা রেখেছিলেন। সরকারপ্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি তাঁর প্রথম পদচারণা হওয়ায় শুরু থেকেই সফরটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অত্যন্ত ব্যস্ততাপূর্ণ ও স্বল্প সময়ের এই সফরে মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এক দীর্ঘ, আন্তরিক ও একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, উক্ত শীর্ষ বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যকার শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা, বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।
এই সফল ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষে চীনের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর এই যাত্রা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির এক অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, একদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্প্রসারণ-এই উভয় পদক্ষেপই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও বিশ্বায়নের পথে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
মালয়েশিয়ার সফরটি যেমন বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমবাজার সুরক্ষিত করতে ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদারে ব্যাপক সহায়ক হবে, ঠিক তেমনি চীনের সফরটি দেশের বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ধারাবাহিক ও অত্যন্ত সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক সফর কেবল দুটি বৃহৎ বন্ধুরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কেরই উন্নয়ন ঘটাবে না, বরং বিশ্বমঞ্চে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ়, শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলবে।
অত্যন্ত পেশাদারিত্ব, কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিচালিত এই ঐতিহাসিক সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে এক নতুন ও সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে।