শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাইব্যুনালের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণ, পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

ট্রাইব্যুনালের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণ, পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও স্পর্শকাতর একটি ঘটনা হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণ ও গুম করার ঘটনা। ২০১২ সালে রাজধানী ঢাকার উচ্চ আদালত বা হাইকোর্ট এলাকা থেকে দিনেদুপুরে তাকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয়।

 

দীর্ঘ সময় পর এই চাঞ্চল্যকর গুমের ঘটনার অন্যতম মূল হোতা হিসেবে তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুর রহমানের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ওই বেআইনি অপহরণের সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

 

এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা একটি চরম স্পর্শকাতর গুমের ঘটনার বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার ও আইন বিশ্লেষকেরা।

 

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কেন্দ্রে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।

 

দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের উপস্থিতিতে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ওই অপহরণের রোমহর্ষক বিবরণ ও গ্রেপ্তারের পেছনের আইনি প্রক্রিয়াগুলো ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, ২০১২ সালে সংঘটিত এই ঘটনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে তাদের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক তলবপত্র বা আইনি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিল।

 

দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক ফোরামের সেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতেই গোয়েন্দা পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই অভিযান পরিচালনা করে এবং অভিযুক্ত সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়।

 

সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা অতীতের সেই ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানান যে, আলোচিত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারিক মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী ছিলেন সুখরঞ্জন বালী।

 

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তিনি যখন আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও পরিকল্পিতভাবে তুলে নেওয়া হয়। সুনির্দিষ্ট তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুর রহমান এই অপহরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি ও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

 

ঘটনার দিন ভুক্তভোগী সুখরঞ্জন বালী যখন আদালত এলাকায় তার গাড়ি থেকে নিচে নামেন, তখন কোনো ধরনের আইনি তোয়াক্কা না করে অভিযুক্ত ফজলুর জনসমক্ষে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন এবং আঘাত করেন।

 

একপর্যায়ে তিনি বালীর জামা চেপে ধরেন এবং জোরপূর্বক তাকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান। এই পরিকল্পিত গুমের ঘটনায় তিনি এবং তার অধীনস্থ পুরো দলটি সরাসরি জড়িত ছিল বলে তদন্তে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আরও জানানো হয় যে, ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনার পর অভিযুক্ত ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তারের জন্য গোয়েন্দা পুলিশের একটি চৌকস দল মাঠে নামে। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক দশটার দিকে রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় অবস্থিত তার নিজ বাসভবনে অভিযান চালানো হয়।

 

সেখান থেকেই তাকে অত্যন্ত সফলভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। আটকের পর প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।

 

পরবর্তীতে বিচারিক আদালতের মাধ্যমে তাকে সরাসরি কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই কঠোর পদক্ষেপ দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এ ধরনের গুরুতর অপরাধ ও বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি চরম ও উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে দেশে ও বিদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে আসছিল।

 

সুখরঞ্জন বালীর এই আকস্মিক গুমের ঘটনার পর থেকেই তার স্বজন, নাগরিক সমাজ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বনামধন্য মানবাধিকার সংস্থা বারবার এর একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু তদন্তের জন্য জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিল।

 

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, বলপূর্বক নিখোঁজ করার মতো ঘটনা চরম মাত্রার অপরাধের শামিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও আইনি টানাপোড়েনের পর এই ঘটনার অন্যতম প্রধান অভিযুক্তের এই গ্রেপ্তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক, সাহসী এবং যুগান্তকারী আইনি পদক্ষেপ হিসেবেই মূল্যায়িত হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই গ্রেপ্তারের ঘটনাটি সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী বার্তা প্রেরণ করেছে। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, আইনি কাঠামোর ভেতরে কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে পারেন না।

 

ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত করার পর যত দীর্ঘ সময় বা বছরই অতিবাহিত হোক না কেন, অপরাধীকে একদিন না একদিন তার কৃতকর্মের জন্য স্বাধীন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে।

 

সুখরঞ্জন বালী অপহরণ ও গুমের এই চাঞ্চল্যকর মামলার আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারিক কার্যক্রম যদি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রতিরোধে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবেও কাজ করবে।