বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের কঠোর আল্টিমেটাম

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের কঠোর আল্টিমেটাম
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করে চলমান উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা নিয়ে উদ্ভূত সংকটের দ্রুত সমাধান এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এক কঠোর আল্টিমেটাম ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

 

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই বিকেলে এক বিক্ষুব্ধ সমাবেশ থেকে তারা এই আল্টিমেটাম প্রদান করেন। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ওই দিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর নিঃশর্ত পদত্যাগ এবং সাম্প্রতিক সময়ে তার দেওয়া বিভিন্ন বিতর্কিত ও অসংগতিপূর্ণ বক্তব্যের জন্য সমগ্র জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা।

 

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশে চলমান শিক্ষার্থী বিক্ষোভ এক নতুন ও চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একটি জাতীয় পরীক্ষার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা যে কতটা গভীর সংকট তৈরি করতে পারে, মঙ্গলবারের এই অবরোধ যেন তারই একটি বাস্তব চিত্র।

 

এদিন বিকেল পৌনে ৫টার দিকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নেওয়া শত শত বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চূড়ান্ত ঘোষণাটি পাঠ করেন ঢাকা সিটি কলেজের পরীক্ষার্থী মো. মিরাজ হোসেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সমবেত শিক্ষার্থী এবং সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্যে জানান যে, আজ সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীকে তার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।

 

একই সাথে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, শিক্ষার্থীদের অনুভূতিতে আঘাত হানে এবং চলমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এমন অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তার জন্য তাকে অবশ্যই জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

 

শিক্ষার্থীদের এই দাবিগুলো কেবল মন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার একটি যৌক্তিক, মানবিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব পুনর্গঠনের দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে বরং শিক্ষার্থীদের মাঝে আরও বেশি বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

 

পরীক্ষা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো তুলে ধরে মো. মিরাজ হোসেন আরও বলেন, গত সোমবার অর্থাৎ ১৩ জুলাই অত্যন্ত প্রতিকূল এবং অস্বস্তিকর এক পরিবেশের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। আবার পরিবেশগত বা অন্যান্য কাঠামোগত অসুবিধার কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী সেই পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েও পরীক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

 

যারা এই অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন এবং যারা একেবারেই পরীক্ষা দিতে পারেননি, তাদের সকলের প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করতে গত ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হওয়া সেই পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ বাতিল করে পুনরায় নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, একটি সুস্থ ও সুষ্ঠু পরিবেশ ছাড়া কোনোভাবেই মেধার সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

 

একই সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শিক্ষানুকূল না হওয়া পর্যন্ত আগামীকালের নির্ধারিত পরীক্ষাও অবিলম্বে বাতিল ঘোষণা করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও বাস্তবসম্মত পরীক্ষার রুটিন প্রকাশের দাবি জানান তারা। পাশাপাশি, ভবিষ্যৎ পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্রের মানদণ্ড যেন কঠোরভাবে শিক্ষার্থীবান্ধব এবং পাঠ্যসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

 

এর আগে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে এসে শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে মূল সড়কে অবস্থান নেন। তাদের এই আকস্মিক অবস্থানের ফলে রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ এবং এর আশপাশের বিশাল এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।

 

গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়টি অবরোধ করার কারণে চারদিকের রাস্তায় আটকা পড়ে শত শত যানবাহন, যার ফলে সৃষ্টি হয় এক তীব্র যানজটের। কর্মব্যস্ত দিনে সাধারণ যাত্রী এবং জরুরি সেবার যানবাহনগুলোকেও দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থেকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

 

তবে শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মুহুর্মুহু স্লোগান দিয়ে পুরো এলাকা প্রকম্পিত করে তোলেন। তাদের চোখে-মুখে ছিল চরম হতাশা ও ক্ষোভের ছাপ, যা তাদের বজ্রকণ্ঠের স্লোগানে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল।

 

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অভিযোগ হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা ও অবহেলা। তারা অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান যে, নিজেদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া নিয়ে তারা সকাল থেকেই রাজপথে টানা আন্দোলন ও অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে তারা রাস্তায় বসে থাকলেও সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো দায়িত্বশীল প্রতিনিধি এখন পর্যন্ত তাদের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতার জন্য এগিয়ে আসেননি।

 

প্রশাসনের এই দীর্ঘ নীরবতা এবং অবজ্ঞা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলশ্রুতিতেই তারা সন্ধ্যা ৬টার মতো একটি চূড়ান্ত ও কঠোর সময়সীমা বেঁধে দিতে বাধ্য হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের মতে, তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে এবং এখন আর পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।

 

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই যৌক্তিক ক্ষোভ এবং রাজপথের উত্তাপ এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখন সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ ঘড়ির কাঁটার দিকে। সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে কোনো ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, নাকি পরিস্থিতি আরও সংঘাত ও অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। নীতিনির্ধারকদের একটি সঠিক সিদ্ধান্তই পারে এই অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের পুনরায় পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে নিতে।