শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম

পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
ছবি: সংগৃহীত

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। শারীরিক অসুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

 

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে, বিকেল ৪টার দিকে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের নিকট তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন। প্রকাশ্যে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ ও ‘অসুস্থতা’র কথা বলা হলেও, এই আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্রে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ক্রান্তিলগ্নে তাঁর নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে।

 

রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক প্যাডে ‘রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ’ শিরোনামে লেখা এই পত্রে তিনি বিদায়বেলায় জাতির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা, সাংবিধানিক ভূমিকা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

 

জাতীয় সংসদের স্পিকারকে ‘শ্রদ্ধাজনেষু’ সম্বোধন করে লেখা চিঠির শুরুতেই মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন।

 

শপথ নেওয়ার পর থেকে আজ অবধি তিনি চরম নিষ্ঠা, সততা এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি অবিচল ও পূর্ণ আনুগত্য বজায় রেখে নিজের ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে এসেছেন।

 

তাঁর এই দায়িত্ব পালনের মেয়াদকালে দেশকে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, যা তিনি তাঁর পদত্যাগপত্রে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।

 

 

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্রে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিষয়টি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটে।

 

সরকারের এই আকস্মিক পতনের ফলে সারা দেশে এক চরম শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যখন দিকনির্দেশনাহীন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছিল, তখন সাংবিধানিক অভিভাবক হিসেবে তিনি এগিয়ে আসেন।

 

চিঠিতে তিনি বিশদভাবে জানান যে, সেই চরম সাংবিধানিক সংকট থেকে জাতিকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে তিনি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনি মতামত ও দিকনির্দেশনা কামনা করেন।

 

পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমেই তিনি সাংবিধানিক শূন্যতা রোধে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছিলেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর দেশের হারানো গণতান্ত্রিক ধারা পুনরুদ্ধারে তাঁর ভূমিকার কথাও তিনি পদত্যাগপত্রে অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে ধরেছেন।

 

তিনি জানান, নবগঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের একটি অবাধ সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে। সেই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতেই দেশের বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে এবং তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে।

 

বর্তমানে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ই অত্যন্ত সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে নিজ নিজ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে বলে তিনি চিঠিতে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন।

 

মো. সাহাবুদ্দিন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে চিঠিতে দাবি করেন যে, সেই সংকটকালীন মুহূর্তে তাঁর সুদৃঢ়, সময়োচিত এবং ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই মূলত দেশে কোনো বড় ধরনের সাংবিধানিক বা রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় ঘটতে পারেনি।

 

চিঠির শেষাংশে তিনি তাঁর পদত্যাগের মূল কারণ হিসেবে নিজের গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান যে, তিনি বর্তমানে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনির নানা জটিলতায় মারাত্মকভাবে ভুগছেন।

 

ইতোমধ্যে তাঁর হৃদযন্ত্রে একটি জটিল বাইপাস সার্জারিও সম্পন্ন হয়েছে। চিঠিতে তিনি আরও একটি গুরুতর স্বাস্থ্যগত তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক একটি অত্যন্ত জটিল রোগ শনাক্ত হয়েছে।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এই স্নায়বিক রোগের প্রভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি মাঝেমধ্যেই হঠাৎ করে কিছু সময়ের জন্য সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়েন, যা যেকোনো মানুষের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অবস্থা।

 

রাষ্ট্রপতি তাঁর চিঠিতে অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান যে, এই সমস্ত জটিল রোগের মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের কারণে তাঁর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এমন শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সাংবিধানিক পদের গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা তাঁর পক্ষে আর কোনোভাবেই সম্ভবপর হচ্ছে না।

 

বর্তমানে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী ও নিবিড় চিকিৎসার একান্ত প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা গভীরভাবে উপলব্ধি করে, তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর উপধারার সুস্পষ্ট বিধান অনুযায়ী স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করার চূড়ান্ত ঘোষণা দেন। তাঁর এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে নতুন এক প্রক্রিয়ার সূচনা হলো এবং নিয়মানুযায়ী শূন্য পদে নতুন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হলো।