শুক্রবার, জুলাই ২৪, ২০২৬
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আকস্মিক সাংবিধানিক পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছে। গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নিজের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন।

 

তাঁর এই পদত্যাগের পরপরই দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের শূন্যতা পূরণে এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

 

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পটপরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক চর্চায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের এই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মমাফিক ক্ষমতার হস্তান্তরের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির এমন প্রস্থান সর্বদাই বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।

 

শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত এক বিশেষ ও জরুরি সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে নতুন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ এই পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় ও পেশাদারিত্বের সাথে জানান যে, বিকেল ৫টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন।

 

নিয়মকানুন ও সাংবিধানিক রীতিনীতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করে তিনি রাষ্ট্রপতির সেই পদত্যাগপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছেন বলে জাতিকে নিশ্চিত করেন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় দলিলটি বর্তমানে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সুরক্ষিত ভাণ্ডারে সংরক্ষিত রয়েছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।

 

তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পরপরই সংবিধান নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রপতির গুরুদায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। রাষ্ট্রের কোনো কাজে যেন বিন্দুমাত্র স্থবিরতা না আসে, সেই লক্ষ্যেই তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সাংবিধানিক দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।

 

বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পদত্যাগপত্রে নিজের শারীরিক অবস্থার এক উদ্বেগজনক ও বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছেন। স্পিকারের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে তিনি অত্যন্ত বেদনাহত হৃদয়ে উল্লেখ করেন যে, তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ একাধিক গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছেন।

 

বিশেষ করে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস এবং কিডনির নানা জটিলতা তাঁর প্রাত্যহিক জীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। অতীতে তাঁর হৃদযন্ত্রে একটি জটিল বাইপাস সার্জারিও সম্পন্ন হয়েছিল, যা তাঁর শারীরিক অবস্থাকে এমনিতেই অত্যন্ত নাজুক করে তুলেছিল।

 

এর পাশাপাশি সম্প্রতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হলে তাঁর শরীরে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক এক অতি জটিল স্নায়বিক রোগ ধরা পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এই মারাত্মক রোগের প্রভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি মাঝেমধ্যেই হঠাৎ করে কিছু সময়ের জন্য সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়েন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

 

মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর চিঠিতে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে স্বীকার করেছেন যে, এই সমস্ত জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব এবং এর ফলে সৃষ্ট অপরিসীম শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা তাঁর পক্ষে আর কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

 

তাঁর এখন দীর্ঘমেয়াদী ও নিবিড় চিকিৎসার একান্ত প্রয়োজন। এই চরম বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের প্রতি নিজের সর্বোচ্চ আনুগত্য ও দায়িত্ববোধ থেকে তিনি পদত্যাগের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর উপধারার কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

 

এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে নিজ পদ ত্যাগ করতে পারেন। সংবিধানে উল্লেখিত এই আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই তিনি তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।

 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক ধারবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, এবং মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পদত্যাগের ক্ষেত্রে সেই নিয়মতান্ত্রিক ও আইনানুগ ধারাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করেছেন, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থা তৈরি না হয়।

 

রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগের পর সাংবিধানিক শূন্যতা রোধে বাংলাদেশ সংবিধানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োগ করা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, নতুন কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

 

এই সাংবিধানিক নির্দেশনার বলেই মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ারে আসীন হয়েছেন। উল্লেখ্য, বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন।

 

তাঁর এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁর কার্যকালের এক আকস্মিক সমাপ্তি ঘটল এবং দেশ এখন নিয়ম অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর দৃঢ়তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। দেশের আপামর জনসাধারণ এখন নতুন রাষ্ট্রপতির আগমন ও আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে গভীর দৃষ্টি রাখছে।