বিদেশি বিনিয়োগকারী বণিক সমিতির উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক বিশেষ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারপ্রধান।
অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, নতুন ও দূরদর্শী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনুকূল, বাধাহীন ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, যে কোনো উদ্যোক্তা বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে মূলধন বিনিয়োগ করলে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়াবে।
এ ক্ষেত্রে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিনিয়োগের পথ সুগম করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি বর্তমান সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী অঙ্গীকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সম্মেলনে উপস্থিত দেশি-বিদেশি বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, সফল বিনিয়োগকারী এবং প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদদের বিপুল উপস্থিতি এই বার্তাই দেয় যে, বৈশ্বিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে।
দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রযুক্তির প্রবর্তন, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালীকরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ভূমিকা অপরিসীম।
দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য তিনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি নিজের বর্ণাঢ্য জীবনের অতীত স্মৃতিচারণ করে জানান, প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে পদার্পণ করার আগে তিনি নিজেও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন।
সেই দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন যে, কেবল একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত দক্ষতা কিংবা রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কোনো ব্যবসার চূড়ান্ত সফলতা অর্জিত হয় না।
একটি ব্যবসাকে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে হলে সরকারের প্রবৃদ্ধি-সহায়ক ও ব্যবসাবান্ধব দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রয়েছে দ্রুত বিকাশমান ও বিশাল আকারের অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজার, পরিশ্রমী ও মেধাবী তরুণ মানবসম্পদ, ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান এবং সর্বোপরি দেশের আপামর জনসাধারণের নিরঙ্কুশ সমর্থনপুষ্ট একটি নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার।
এই মৌলিক ও শক্তিশালী নিয়ামকগুলোই বাংলাদেশকে একটি টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত এবং সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতনির্ভর একটি আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশবাসীর সামনে উত্থাপিত ইশতেহারেও এই যুগান্তকারী অর্থনৈতিক রূপান্তরের অত্যন্ত সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করা হয়েছে বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শুধু সাময়িক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ নয়, বরং বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক উন্নয়নযাত্রার একজন বিশ্বস্ত ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হওয়ার জন্য আন্তরিক আহ্বান জানান।
দায়িত্ব গ্রহণের পর গত পাঁচ মাসে বর্তমান সরকারের নেওয়া নানা গঠনমূলক পদক্ষেপের বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও নীতিগত সংস্কারের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, প্রথিতযশা ব্যবসায়ী, স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক আলোচনার ভিত্তিতেই সরকার বিনিয়োগবান্ধব সংস্কারের মূল ক্ষেত্রগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে।
এসব আলোচনার প্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের প্রধান চাওয়াগুলো, যেমন-আইনি সুরক্ষা জোরদার করা, আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা, কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও আধুনিক করা, অর্জিত মুনাফা বিনা বাধায় নিজ দেশে প্রেরণের সুযোগ নিশ্চিত করা, একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গঠন এবং বিশ্বমানের উন্নত অবকাঠামো নির্মাণে সরকার ইতোমধ্যে দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে।
বিনিয়োগের পথ আরও মসৃণ করতে সরকার আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগের আইনি সুরক্ষা প্রদান, যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, কর ও মূল্য সংযোজন কর প্রশাসনকে সহজীকরণ এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বাধামুক্ত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজারকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা, নতুন ও উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, সরকারি সব ধরনের সেবাকে সম্পূর্ণরূপে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা এবং বন্দর, পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মানোন্নয়নে সরকার ব্যাপক ও বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক লাখ কোটি ডলার বা এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থনীতিতে উন্নীত করতে তার সরকার সম্পূর্ণভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এই উচ্চাভিলাষী অথচ বাস্তবসম্মত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার বেশ কয়েকটি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করেছে। এগুলোর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ শিল্প, আধুনিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উচ্চমূল্যের উন্নত বস্ত্রশিল্প, বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা অন্যতম।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে আগামী দিনে অন্যতম বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, চিরাচরিত তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন।
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এই বিষয়টি স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি কেবল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরই নির্ভরশীল নয়, বরং বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।