শুক্রবার, জুলাই ২৪, ২০২৬
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের দাবি

সংবিধান রক্ষা ও নতুন সরকার গঠন আমারই কৃতিত্ব

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:০২ পিএম

সংবিধান রক্ষা ও নতুন সরকার গঠন আমারই কৃতিত্ব
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পরপরই গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক ও একান্ত প্রতিক্রিয়ায় তিনি নিজের মেয়াদকালের নানা দিক, বিশেষ করে দেশের ক্রান্তিলগ্নে তার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা ও প্রেক্ষাপট অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন যে, দেশের চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও তিনি পবিত্র সংবিধান রক্ষা করেছেন এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকার মূলত তার সেই বলিষ্ঠ সাংবিধানিক পদক্ষেপেরই একটি সফল ফসল।

 

পদত্যাগের পর নিজের দায়িত্ব পালন সম্পর্কে গভীর মূল্যায়ন করতে গিয়ে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন জানান, তিনি কোনো অপরাধী নন এবং পুরো সময় জুড়ে তিনি অত্যন্ত সততা ও মাথা উঁচু করে নিজের ওপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন।

 

তিনি বিশেষভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী ভয়াবহ রাজনৈতিক শূন্যতার কথা স্মরণ করেন। ওই সময়কার চরম অস্থিতিশীল, সংঘাতময় ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে তিনি যেভাবে রাষ্ট্রীয় সংকট মোকাবিলা করেছেন, তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে গর্ববোধ করেন বলে জানান।

 

তার ভাষ্যমতে, দেশ যখন একটি গভীর সাংবিধানিক সংকট ও অরাজকতার দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সংবিধানকে আঁকড়ে ধরেছিলেন এবং রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

 

গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তার সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগের বিষয়টিও অত্যন্ত সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর দেশে যখন কোনো কার্যকর সরকার ছিল না এবং একটি ভয়াবহ শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা বিরাজ করছিল, তখন রাষ্ট্রপতির একক সাংবিধানিক ক্ষমতাবলেই তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দিয়েছিলেন।

 

সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অত্যন্ত সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে এবং পরবর্তীতে তাদের অধীনেই একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই গঠিত হওয়া একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ও নির্বাচিত সরকার বর্তমানে দেশ পরিচালনা করছে।

 

দেশের শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে তিনি নিজের একটি ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী কৃতিত্ব হিসেবেই বিবেচনা করছেন। এদিকে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রকৃত কারণ নিয়ে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে চলমান নানা ধরনের জল্পনাকল্পনা এবং গুজবের বিষয়েও তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মুখ খুলেছেন।

 

বিভিন্ন মহলের রাজনৈতিক চাপ কিংবা কোনো বিশেষ প্রভাবশালী জায়গা থেকে টেলিফোন আসার কারণে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমে যে খবর প্রচারিত হচ্ছে, তা তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, শারীরিক অসুস্থতাই তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার একমাত্র প্রধান ও সত্য কারণ। উল্লেখ্য, তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্নায়বিক নানা জটিলতাসহ শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

 

সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত অন্যান্য তথ্যগুলোকে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, মানুষ নিজেদের কল্পনার ওপর নির্ভর করে ভিত্তিহীন গল্প তৈরি করেছে, যার বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।

 

রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন ছাড়ার বিষয়েও সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধান তার অবস্থান একেবারে পরিষ্কার করেছেন। বিদ্যমান আইনি বিধান অনুযায়ী, পদত্যাগের পরও একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির সর্বোচ্চ এক মাস পর্যন্ত বঙ্গভবনে সপরিবারে অবস্থান করার সুযোগ রয়েছে।

 

তবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, তিনি এই আইনি সুযোগ গ্রহণ করতে একেবারেই ইচ্ছুক নন। বরং, যত দ্রুত সম্ভব তিনি সরকারি বাসভবনের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রাজধানীর নিজস্ব বাসভবনে স্থানান্তরিত হবেন।

 

সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলেও, বিদায়বেলায় তিনি নিজের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকার যে জোরালো পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার জন্ম দেবে।

 

চরম সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো দেশবাসীকে কীভাবে একটি স্থিতিশীল শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে নিয়ে গেছে, তিনি মূলত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পরিমণ্ডলে সেই বার্তাই দিতে চেয়েছেন।

 

তার এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল এবং দেশের শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।