বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি নিরিবিলি আবাসিক এলাকার বহুতল ভবনে সাধারণ জীবনযাত্রার আড়ালে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন অপরাধ চক্রের সক্রিয় কার্যালয়। বাইরে থেকে ভবনটিকে একটি সাধারণ পারিবারিক আবাসস্থল মনে হলেও, এর ভেতরে দিনরাত চলছিল তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নানা ধরনের আর্থিক ও ডিজিটাল প্রতারণার কার্যক্রম।
দীর্ঘ নজরদারির পর নগরীর খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের মোট ৬৩ জন নাগরিককে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ।
বাংলাদেশ রিলেটেড নিউজ
শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ জানান, খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার চার নম্বর সড়কের একটি সুনির্দিষ্ট ভবনে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এবং স্থানীয় খুলশী থানা পুলিশ যৌথভাবে এই সুপরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করে।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, ভবনটির মূল মালিক একজন প্রবাসী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে বসবাস করছেন। প্রায় দেড় মাস আগে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ওই বাড়িটি ভাড়া নেয় এবং এরপর থেকেই সেখানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক একত্রিত হয়ে কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে বসবাস ও কম্পিউটারভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযান পরিচালনার সময় বাড়িটির ভেতর আধুনিক অনলাইন অপরাধ চক্রের একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রমাণ পেয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে সর্বমোট একশত চৌত্রিশটি উন্নত মডেলের মুঠোফোন এবং ৫৭টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে।
অর্থাৎ সেখানে অবস্থানরত প্রতিটি নাগরিকের অনুকূলে গড়ে দুইটিরও বেশি মুঠোফোন এবং প্রায় প্রত্যেকের জন্যই একটি করে নিজস্ব ল্যাপটপ সক্রিয় অবস্থায় ছিল। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে একটি অ্যাপল ট্যাবলেট, কম্পিউটারের কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ অংশ বা সিপিইউ, মনিটর, কিবোর্ড, মাউস, প্রিন্টার এবং পাঁচটি পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে চারটি সক্রিয় সিমকার্ড, পাকিস্তানের তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং কম্বোডিয়ার একটি বৈধ কর্মসংস্থান ছাড়পত্র। বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের এই উপস্থিতি নিশ্চিত করে যে, সেখানে অত্যন্ত নিখুঁত ও পেশাদার পদ্ধতিতে আন্তদেশীয় সাইবার অপরাধ চক্র পরিচালিত হচ্ছিল।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, এই বিশাল নেটওয়ার্কের ব্যাপ্তি কেবল ওই ভবনে আটক ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু দেশি ও বিদেশি সহযোগী অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছে।
এদের অনেকেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান করে পর্দার আড়াল থেকে চক্রটিকে নিয়মিত নানামুখী রসদ জুগিয়ে আসছিল। বিশেষ করে এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের জন্য গোপন বাসস্থান নিশ্চিত করা, প্রতিদিনের যাতায়াত ও খাদ্য সরবরাহ, প্রযুক্তিগত জটিল সরঞ্জামাদি সংগ্রহ এবং সন্দেহাতীতভাবে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার মতো সংবেদনশীল কাজে স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া পরিচালনা করা অসম্ভব।
ফলে এই দেশীয় সহযোগীদের পরিচয় শনাক্ত ও তাদের আইনের আওতায় আনাকে তদন্তের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছে পুলিশ। আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধীদের জন্য ভৌগোলিক অবস্থান খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, অপরাধ সংঘটনের কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রামকে বেছে নেওয়ার পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
দেশের প্রধান বাণিজ্যিক ও বন্দরনগরী হওয়ায় চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, বহুজাতিক প্রকল্পের কাজ এবং পর্যটনের সূত্রে বিদেশিদের স্বাভাবিক যাতায়াত সর্বদা বিদ্যমান থাকে। এই আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নাগরিক ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্রটি খুব সহজেই জনসমক্ষে নিজেদের আড়াল করতে পেরেছিল।
তবে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা ঠিক কী ধরনের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন, তারা বৈধ নথিপত্র নিয়ে অবস্থান করছিলেন কি না এবং ঠিক কোন আন্তর্জাতিক বন্দর বা সীমান্ত দিয়ে তারা চট্টগ্রামে পৌঁছালেন, সে সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদ্ধার করা সমস্ত ডিজিটাল ডিভাইসের জন্য ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই ডিভাইসগুলোর ইন্টারনেট ইতিহাস, তথ্য আদান-প্রদান, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন এবং ব্যবহৃত বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।
এই তথ্যভাণ্ডার থেকে স্পষ্ট হওয়া যাবে যে, তারা ঠিক কী কৌশলে সাধারণ মানুষ কিংবা বিদেশি কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল এবং এই প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের ভৌগোলিক অবস্থান কোথায়।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম জানিয়েছেন, বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং চক্রটির সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে রিমান্ড আবেদনসহ আইনি কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।