সন্তানদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার পর ওই পাষণ্ড বাবা নিজেও বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। বর্তমানে তিনি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও মুমূর্ষু অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই অমানবিক ও মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা সুনামগঞ্জ অঞ্চলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং সামাজিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ চিত্র সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অভাবনীয় ও লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে।
গভীর রাত আনুমানিক একটার দিকে তাহিরপুর উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের রজনীলাইন গ্রামে এই বিষপানের ঘটনা ঘটে। নিহত তিন শিশু হলো দশ বছর বয়সী কন্যা মাওয়া, সাত বছর বয়সী পুত্র তামিম এবং মাত্র দুই বছর বয়সী ফুটফুটে শিশুপুত্র শামিম।
এই বয়সে যাদের হাসিখুশিতে পুরো বাড়ি মেতে থাকার কথা, আজ সেখানে শুধুই নিস্তব্ধতা আর স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদ। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শরাফত আলীর স্ত্রী অর্থাৎ ওই তিন হতভাগ্য শিশুর মা পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে দীর্ঘ সময় ধরে সুদূর সৌদি আরবে প্রবাসী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
মায়ের অনুপস্থিতিতে সন্তানদের লালনপালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল বাবা শরাফতের ওপর। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন এবং সর্বনাশা জুয়া খেলায় মারাত্মকভাবে আসক্ত ছিলেন। ঘটনার দিন শুক্রবার বিকেলে শরাফত আলী তার তিন শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় বড়ছড়া বাজারে গিয়েছিলেন।
প্রতিবেশী ও আত্মীয় রনু মিয়া এই ঘটনার মর্মান্তিক পূর্বাপর বর্ণনা করে জানান, বাজার থেকে রাতে বাড়ি ফেরার পথে শরাফত সন্তানদের জন্য খাবার হিসেবে বিরিয়ানি কিনে নিয়ে যান। স্থানীয়দের এবং পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ওই বিরিয়ানির ভেতরেই অত্যন্ত সুকৌশলে বিষ মিশিয়েছিলেন তিনি।
এরপর বাড়িতে ফিরে রাতের কোনো একসময় সেই বিষ মেশানো খাবার অবুঝ সন্তানদের খাইয়ে নিজেও তা ভক্ষণ করেন। নিজের বাবার হাত থেকে পাওয়া সেই খাবার খেয়েই যে অবুঝ শিশুদের চিরতরে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে, তা হয়তো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি তারা।
বিষক্রিয়ার প্রভাব শুরু হলে রাতের অন্ধকারেই শিশুদের আর্তনাদ ও ছটফটানি শুরু হয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রতিবেশী এবং স্বজনরা দ্রুত এগিয়ে আসেন। তারা প্রথমে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় তিন শিশু এবং তাদের বাবা শরাফতকে উদ্ধার করে নিকটবর্তী বাদাঘাট বাজারের স্থানীয় চিকিৎসক ডা. হাফিজ উদ্দিনের কাছে নিয়ে যান।
সেখানে অবস্থার অবনতি হলে শনিবার সকাল সাতটা বিশ মিনিটের দিকে তাদের সবাইকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, বিষক্রিয়ায় জীবনপ্রদীপ নিভে যায় তিনটি নিষ্পাপ শিশুর।
তাহিরপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. ফৌজিয়া এই মর্মান্তিক ঘটনার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, প্রাথমিক শারীরিক লক্ষণ ও পরিস্থিতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে যে, বিষপানের মূল ঘটনাটি রাত একটা থেকে দেড়টার দিকেই সংঘটিত হয়েছে।
সকালের দিকে যখন চারজনকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তখন চিকিৎসকদের আর কিছুই করার ছিল না। দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি নিশ্চিত করেন যে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ওই তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে, বাবা শরাফত আলীর শরীরে বিষক্রিয়ার মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকায় এবং তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায়, তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরই মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, নিহত তিন শিশুর মরদেহ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য প্রাথমিক অবস্থায় তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই রাখা হয়েছিল।
পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে মরদেহগুলো সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও জানান, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলে নিখুঁত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশও প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে যে, অভিযুক্ত শরাফত মিয়া দীর্ঘদিন ধরে জুয়া ও মাদকের নেশায় গভীরভাবে ডুবে ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, মাদক ও জুয়ার কারণে সৃষ্ট পারিবারিক কলহ, চরম হতাশা বা মানসিক বিকারগ্রস্ততা থেকেই তিনি নিজের সন্তানদের হত্যা করে আত্মহত্যার এই ভয়ানক পথ বেছে নিয়েছেন।
প্রবাসে থাকা এক অসহায় মায়ের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া এবং মাদকের ছোবলে একটি সাজানো পরিবারের এমন করুণ পরিণতি সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এই ঘটনার মাধ্যমে মাদকাসক্তি ও জুয়ার মতো সামাজিক ব্যাধি কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে, তা আবারও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।
যখন পরিবারের প্রধান রক্ষকই মাদকের নেশায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ভক্ষকের রূপ ধারণ করেন, তখন সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গভীর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। পুরো এলাকা জুড়ে এখন কেবলই শোকের মাতম চলছে এবং এই জঘন্যতম অপরাধের পেছনের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে।