রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই বিক্ষুব্ধ ও শোকাহত শিক্ষার্থীদের পদচারণায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোড সংলগ্ন মহাসড়ক এলাকা। এই আকস্মিক ও সর্বাত্মক অবরোধের ফলে দেশের অন্যতম প্রধান এই যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যা সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ঘটনার ভয়াবহতা ও শোকের মাত্রাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছে।
একটি উদীয়মান জীবনের এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছে না কেউই। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, রবিবার সকাল সোয়া দশটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিহত কিশোর ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজার পর থেকেই ক্যাম্পাসে এক অত্যন্ত শোকাবহ এবং একইসঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিহত কিশোরের সহপাঠী, শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত সাধারণ শিক্ষার্থী কান্না ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এরপরই তারা একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দিকে অগ্রসর হন।
বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে তারা মহাসড়কে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে সব ধরনের দূরপাল্লার ও স্থানীয় যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। এর ফলে মহাসড়কের উভয় দিকে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং পরিবহন ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদী ও আবেগঘন বাক্য সংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন। তারা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার এবং আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন।
এ সময় শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘জ্বালোরে জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’, ‘দড়ি লাগলে দড়ি নে, খুনিরে ফাঁসি দে’ এবং ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’ ইত্যাদি জোরালো ও মর্মস্পর্শী স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকে।
তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র প্রতিবাদ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং কোমলমতি শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সমাজের সামনে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান এবং কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলের দিকে মায়ের একটি মূল্যবান মুঠোফোন (আইফোন) নিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য ও নিজের ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয় সে। এরপর আর সে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেনি।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও সন্তানকে না পেয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার ওই দিনই সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন। পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালালেও শুক্রবার তার কোনো সন্ধান মেলাতে পারেনি।
নিখোঁজ হওয়ার পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের অদূরে লালমাই পাহাড় ঘেঁষা সানন্দা গ্রামের একটি নির্জন ঝোপের ভেতর থেকে অপ্রতিমের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই হৃদয়বিদারক খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও কোটবাড়িতে শোকের গভীর ছায়া নেমে আসে।
প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারণা করছে, হাতের মূল্যবান মুঠোফোনটি ছিনতাই করার হীন উদ্দেশ্যেই এই নিষ্পাপ কিশোরকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এই পাশবিক ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে তুহিন (১৯) ও আনাস নামের দুই তরুণকে আটক করেছে।
বর্তমানে তাদেরকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। সার্বিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিছুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখায় দুই পাশেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে এবং যানজট ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ তুলে নিলে দ্রুত যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মহাসড়কে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে, পুরো ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন ও অগ্রগতি গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরতে রবিবার দুপুরে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এর আগে, রবিবার বেলা এগারোটা চল্লিশ মিনিটের দিকে এক শোকাবহ পরিবেশের মধ্য দিয়ে নিজ বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানে কিশোর অপ্রতিমের মরদেহ চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।