মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আইআরজিসি

জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ডকে পুড়িয়ে ছাই করা হবে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:২১ পিএম

জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ডকে পুড়িয়ে ছাই করা হবে
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং দখলদার শক্তিগুলো। দীর্ঘদিনের এই স্নায়ুযুদ্ধ এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির মাঝে নতুন করে এক অত্যন্ত কঠোর, সময়োপযোগী ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা প্রদান করেছে তেহরান।

 

ইরানের সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে যে, তাদের দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যদি কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হয়, তবে তার পরিণতি হবে কল্পনাতীত এবং ভয়াবহ।

 

আইআরজিসির মুখপাত্র এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ ধরনের কোনো অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ নেওয়া হলে দখলকৃত ভূখণ্ডকে চিরতরে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া এক বিরানভূমিতে পরিণত করা হবে।

 

এই পাল্টাহামলার মাত্রা এতটাই তীব্র হবে যে, সেখানকার দখলদারদের বাধ্য হয়ে প্রতিবেশী মিসরের সিনাই মরুভূমিতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই খবর প্রচার করেছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রার উত্তাপ ছড়িয়েছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাত দিয়ে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা পার্সটুডের প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশেষ বার্তায় এই চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

 

তিনি তার লিখিত বার্তায় অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, শত্রুরা যদি ইরানের তেল, গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানার মতো কোনো দুঃসাহস দেখায়, তবে সাময়িক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তা খুব দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

 

কারণ, ইরানের নিজস্ব তরুণ, মেধাবী ও অদম্য বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনরায় নির্মাণ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। কিন্তু আগ্রাসনের জবাবে ইরান যে পাল্টা আঘাত হানবে, তার ধ্বংসলীলা থেকে দখলদারদের রক্ষা করার কেউ থাকবে না।

 

তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় লেখেন যে, দখলকৃত ভূখণ্ডকে চিরতরে এমন এক দগ্ধ ভূমিতে পরিণত করা হবে, যেখানে প্রাণের কোনো স্পন্দন থাকবে না এবং দখলদারদের শেষ পরিণতি হবে সিনাই মরুভূমিতে যাযাবর বা উদ্বাস্তুর জীবনযাপন করা।

 

নিজের বার্তার একেবারে শেষাংশে এসে তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশে এক প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “বিশ্ব দেখবে, কী ঘটতে যাচ্ছে।” তার এই ছোট কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী মন্তব্যটি পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সমর বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসি মুখপাত্রের এই বক্তব্য বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি নিখুঁত প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে দখলদার শক্তি বারবার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে সামরিক হামলা চালানোর প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে আসছে।

 

এই ধরনের হুমকির প্রেক্ষাপটেই ইরান তাদের নিজস্ব প্রতিরোধমূলক কৌশল হিসেবে পাল্টা এই চরম হুঁশিয়ারি প্রদান করেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই বক্তব্য কেবল ফাঁকা আওয়াজ নয়; বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রস্তুতি, উন্নত ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে গড়ে তোলা শক্তিশালী প্রতিরোধ কাঠামোর ওপর অগাধ আত্মবিশ্বাসেরই বহিঃপ্রকাশ।

 

ইরান স্পষ্টভাবেই এই বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা আর কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাদের ভূখণ্ডে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন হলে তা সমগ্র অঞ্চলজুড়ে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দাবানল উসকে দেবে, যার চূড়ান্ত মূল্য চোকাতে হবে খোদ আগ্রাসী শক্তিকেই।

 

ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো কেবল তাদের নিজস্ব অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও এক অত্যন্ত বড় নিয়ামক। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনকারী দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে ইরানের এক অনন্য অবস্থান রয়েছে।

 

যদি সত্যিই তাদের জ্বালানি স্থাপনায় কোনো ধরনের সামরিক হামলা হয়, তবে তা বৈশ্বিক তেল সরবরাহে এক মারাত্মক সংকট তৈরি করবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কল্পনাতীতভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়া-পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করবে।

 

তাই আইআরজিসির এই হুঁশিয়ারি কেবল নির্দিষ্ট একটি প্রতিপক্ষের প্রতি নয়, বরং এটি পুরো বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিও এক ধরনের সতর্কবার্তা। ইরান মূলত পরাশক্তিগুলোকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, তারা যেন তাদের মিত্রদের এ ধরনের আগ্রাসী পদক্ষেপ থেকে নিবৃত্ত রাখে, অন্যথায় পুরো বিশ্বকেই এর চরম অর্থনৈতিক ও সামরিক মাশুল গুনতে হবে।

 

অন্যদিকে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বির মন্তব্যে ‘সিনাই মরুভূমি’ এবং ‘উদ্বাস্তু’ শব্দগুলোর ব্যবহার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ভূরাজনৈতিক রণকৌশলের অংশ। ঐতিহাসিকভাবে সিনাই মরুভূমি একটি অত্যন্ত রুক্ষ এবং জনবসতিহীন এলাকা হিসেবে পরিচিত।

 

দখলদারদের সেই মরুভূমিতে বিতাড়িত করার কথা বলে আইআরজিসি মূলত প্রতিপক্ষের সম্পূর্ণ ভৌগোলিক ও অস্তিত্বগত বিলুপ্তির দিকেই ইঙ্গিত করেছে। এটি শত্রুর মনে চরম ভীতি ও হতাশা সৃষ্টির একটি ধ্রুপদি কৌশল।

 

এর মাধ্যমে ইরান তাদের প্রতিপক্ষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা আবাসস্থল কতটা ভঙ্গুর এবং যেকোনো সময় তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্ন তারা দেখে আসছে, ইরানের একটি সুপরিকল্পিত ও বিধ্বংসী পাল্টাহামলা সেই স্বপ্নকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিতে সক্ষম।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান নিজেদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটিয়েছে, বিশেষ করে সামরিক ও পারমাণবিক প্রযুক্তিতে তাদের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। পশ্চিমাদের শত শত অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধের মুখে দাঁড়িয়েও তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে সামরিক সরঞ্জাম থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

 

আইআরজিসির মুখপাত্র যখন তরুণ বিজ্ঞানীদের দিয়ে খুব দ্রুত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কথা বলেন, তখন মূলত তিনি এই স্বনির্ভরতার ওপরই জোর দিয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, শত্রুর হামলা হয়তো ইরানের কিছু ভৌত কাঠামোর ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু তাদের বিজ্ঞানীদের মেধা, দক্ষতা এবং দেশপ্রেমকে ধ্বংস করতে পারবে না।

 

যেকোনো ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্জন্ম লাভের প্রবল ইচ্ছাশক্তি ইরানি জাতির রয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ আর অবশিষ্ট থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান এবং তার মিত্ররা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত এবং ঐক্যবদ্ধ।

 

লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং ইরাকে থাকা ইরানের মিত্র শক্তিগুলোও এই কৌশলগত যুদ্ধের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যদি ইরানের মূল ভূখণ্ডে, বিশেষ করে তাদের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত তেল শোধনাগার বা গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে কোনো ধরনের সামরিক আঘাত আসে, তবে এই মিত্র শক্তিগুলোও চারদিক থেকে একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

 

তখন এই সংঘাত আর কেবল দুটি পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। আইআরজিসির এই হুঁশিয়ারির পেছনে তাদের এই বিস্তৃত আঞ্চলিক শক্তির নীরব সমর্থন এবং সামরিক কৌশলও সমানভাবে কাজ করছে।

 

সার্বিকভাবে, আন্তর্জাতিক মহলে এই বক্তব্যের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের এই লাগামহীন উত্তেজনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্বনেতাদের মধ্যে এ নিয়ে এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাতে কোনোভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।

 

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে কোনো একটি দেশকে কোণঠাসা করার বা তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সামরিক হামলার হুমকি দেওয়ার নীতি যে সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং চরম আত্মঘাতী-আইআরজিসির এই কঠোর বার্তার মাধ্যমে সেটিই আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বির এই বক্তব্যটি বিশ্ব ভূরাজনীতিতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, অমোঘ এবং নির্ণায়ক বার্তা হিসেবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।

 

দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সামরিক হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও যে জাতি নিজেদের অস্তিত্ব কেবল টিকিয়েই রাখেনি, বরং তাকে আরও সুসংহত ও অপ্রতিরোধ্য করেছে, সেই জাতির জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত করে তাদের নিশ্চিহ্ন করার স্বপ্ন দেখা যে চরম বোকামি-সেটিই আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য।

 

শত্রুরা আগ্রাসনের ফাঁদে পা দিলে আজ নিজেরাই চূড়ান্ত অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হবে। আগামী দিনগুলোতে এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কোন দিকে মোড় নেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংঘাত এড়াতে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, এখন সেদিকেই গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে নজর রাখছে পুরো বিশ্ব।

 

- পার্সটুডে