প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার অবসান এবং শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অত্যন্ত দ্রুতগতিতে হ্রাস পাবে। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে এই প্রত্যাশা পূরণ হওয়া বেশ কঠিন।
তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও তার গতি হবে অত্যন্ত ধীর ও মন্থর, যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত দ্রুত গতিতে হ্রাস পাওয়ার সমকক্ষ নয়।
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের জনগণকে একটি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক সমঝোতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি সে সময় উল্লেখ করেছিলেন যে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সাময়িক অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বর্তমান যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারমূল্যকে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার দুই দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কোনো অলৌকিক বা তাৎক্ষণিক স্বস্তি আসবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে।
তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল প্রায় সত্তর ডলার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান সংকটের গভীরতা বিবেচনায় তেলের দাম আবার সেই আগের যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে ২০৩১ সালের শেষ ভাগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে একাধিক বাস্তব ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান হরমুজ প্রণালির বিভিন্ন অংশে বিপুল পরিমাণ মাইন পুঁতে রাখায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল চরমভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে অত্যন্ত সংকীর্ণ মাত্র দুটি পথ দিয়ে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল করতে পারছে। এই বিশাল জলসীমা থেকে মাইনগুলো সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করতে বিশেষজ্ঞদের কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লেগে যাবে।
এ ছাড়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্পর্শকাতর স্থাপনা মেরামত করে আগের মতো স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে উৎপাদনকারী দেশগুলোর কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে।
সর্বোপরি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি নিরাপদ করতে এই শান্তিচুক্তির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু এই অঞ্চলে এখনো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে পুনরায় হামলার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও তা হবে অত্যন্ত ধীরগতির।